মানবজাতির ইতিহাসে কিছু জীবন আছে, যেগুলো শুধু একটি সময়কে বদলায় না, বরং যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন তেমনই এক অনন্য আলো। তিনি কোনো রাজপ্রাসাদে জন্ম নেননি, কোনো সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ছিলেন না। তিনি জন্মেছিলেন মক্কার মরুপ্রান্তরে, ইয়াতিম অবস্থায় বড় হয়েছেন, দারিদ্র্য দেখেছেন, উপহাস সহ্য করেছেন, প্রিয়জন হারিয়েছেন, তবু সত্যের দাওয়াত থেকে সরে যাননি।
যখন আরব সমাজ ছিল শিরক, অন্যায়, সুদ, নারী নির্যাতন, গোত্রবাদ ও রক্ত প্রতিশোধে ডুবে, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ এক, মানুষ সমান, জুলুম হারাম, সত্যই মুক্তির পথ। এই আহ্বানের কারণে তাঁকে পাথর মারা হয়েছে, সামাজিক বয়কট করা হয়েছে, মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন, শিয়াবে আবি তালিবে ক্ষুধা সহ্য করেছেন, কিন্তু মানবতার ডাক থামাননি।
মদিনায় হিজরতের পর তিনি শুধু ধর্মীয় নেতা নন, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক, শিক্ষক ও দয়ার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ২৩ বছরের সংগ্রামে তিনি বিভক্ত আরবকে এক উম্মাহতে রূপান্তরিত করেন।
তারপর এলো হিজরি দশম বছর। মহানবী (সা.) ঘোষণা দিলেন, তিনি হজ করবেন। লক্ষাধিক সাহাবী তাঁর সঙ্গে রওনা হলেন। অনেকেই অনুভব করছিলেন, এটি হয়তো প্রিয় নবীর শেষ হজ। ইতিহাসে সেটিই পরিচিত হলো হজ্জাতুল বিদা বা বিদায় হজ নামে।
সাহাবী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বের হলাম। চারদিক থেকে মানুষ আসছিল। কেউ সামনে, কেউ পেছনে, কেউ ডানে, কেউ বামে। সবাই নবীজির কাছ থেকে হজের বিধান শিখতে চায়, তাঁর প্রতিটি আমল অনুসরণ করতে চায়।
সহিহ মুসলিম, হাদিস (১২১৮)
সাহাবীদের মনে তখন আনন্দের সঙ্গে এক অদ্ভুত বেদনা কাজ করছিল। কারণ নবী (সা.) প্রতিটি কাজ এমনভাবে শেখাচ্ছিলেন, যেন বিদায়ের আগে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে যেতে চান।
৯ জিলহজ। আরাফার বিশাল প্রান্তর। সূর্যের তাপ, মরুর বাতাস, আর লক্ষাধিক সাহাবীর সমাবেশ। মহানবী (সা.) তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ প্রদান করেন। বিভিন্ন সহিহ হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে সংকলিত তাঁর ভাষণের মূল বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো।
তিনি বললেন,
হে মানুষ, তোমরা আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। কারণ আমি জানি না, এ বছরের পর আমি তোমাদের সঙ্গে এ স্থানে আর মিলিত হতে পারব কি না।
হে মানুষ, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য তেমনই পবিত্র, যেমন আজকের এই দিন পবিত্র, এই মাস পবিত্র, এই নগর পবিত্র।
সহিহ বুখারি (১৭৩৯)
জেনে রাখো, জাহেলি যুগের সব প্রথা আজ আমার পদতলে চূর্ণ হলো।
জাহেলি যুগের সব রক্ত প্রতিশোধ বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমাদের বংশের ইবনে রাবিয়ার রক্ত দাবি বাতিল করলাম।
জাহেলি যুগের সব সুদ বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সব সুদ বাতিল করলাম।
নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ। তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।
আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব।
সহিহ মুসলিম
হে মানুষ, তোমাদের প্রতিপালক একজন, তোমাদের পিতা একজন। সবাই আদম থেকে, আর আদম সৃষ্টি হয়েছেন মাটি থেকে।
কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সাদার ওপর কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কালোর ওপর সাদারও নেই। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ায়।
মুসলমান মুসলমানের ভাই। কারও সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা হালাল নয়।
যারা উপস্থিত আছ, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে আমার কথা পৌঁছে দেয়। কারণ যারা পরে শুনবে, তারা উপস্থিত অনেকের চেয়েও ভালোভাবে বুঝবে।
হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?
সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।
তখন তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে বললেন,
হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। সেই দিন আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন:
ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْهِكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَٰمَ دِينًا ۚ
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত ৩
হযরত উমর (রা.) বলতেন, আমরা জানি এ আয়াত কোন দিন নাজিল হয়েছিল। আরাফার দিন, জুমার দিন। এ আয়াত ছিল নবুওয়াতের মিশন পূর্ণতার ঘোষণা।
ভাষণের সময় বহু সাহাবীর চোখ ভিজে উঠেছিল। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, নবী (সা.) হয়তো শেষবারের মতো এত বড় সমাবেশে কথা বলছেন।
হযরত আবু বকর (রা.) ভাষণের কিছু অংশ শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এটি বিদায়ের ইঙ্গিত।
দেখুনঃ ডায়াবেটিক রোগীদের হজের প্রস্তুতি
বিদায় হজের কিছুদিন পর মহানবী (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বারবার নামাজের গুরুত্ব, মানুষের হক, দাসদাসীর অধিকার এবং উম্মাহর ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
এরপর রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। পৃথিবী হারায় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে, কিন্তু উম্মাহ পেয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ দ্বীন, কুরআন এবং সুন্নাহর আলো।
আজকের বিশ্বে হত্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি বাড়ছে। বিদায় হজ শেখায় মানুষের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
নবী (সা.) সুদ বাতিল করে অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
তিনি নারীদের আল্লাহর আমানত বলেছেন। এটি নারীর মর্যাদার স্পষ্ট ঘোষণা।
জাতি, ভাষা, গায়ের রঙ নয়, মর্যাদা নির্ধারিত হবে তাকওয়ায়।
উম্মাহর পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ।
এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর শেখানো পূর্ণাঙ্গ হজের বাস্তব রূপ। তিনি বলেছেন:
তোমরা তোমাদের হজের বিধান আমার কাছ থেকে শিখে নাও। (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ হজ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ত্যাগ, ঐক্য ও আনুগত্যের শিক্ষা।
মহানবী (সা.) রাজত্ব রেখে যাননি, রেখে গেছেন ন্যায়নীতি। ধনসম্পদ রেখে যাননি, রেখে গেছেন কুরআন। প্রাসাদ রেখে যাননি, রেখে গেছেন চরিত্রের সাম্রাজ্য।
আরাফার ময়দানে তাঁর সেই ভাষণ আজও মানবজাতির জন্য আলো। যদি মুসলিম উম্মাহ বিদায় হজের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে, তবে বিভক্তি থেকে ঐক্যে, অন্যায় থেকে ন্যায়ে, অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসা সম্ভব।
পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে সোমবার, তবে এরই মধ্যে গত বছরের মোট বিদেশি হজযাত্রীর রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে এবারের হজ। পবিত্র মক্কা ও মদিনায় এখন পর্যন্ত বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা ১৫ লাখের বেশি বিদেশি হজযাত্রী পৌঁছেছেন এবং এই সংখ্যা প্রতি মুহূর্তেই বাড়ছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি আরবের পাসপোর্ট অধিদপ্তরের হজ কমান্ডিং অফিসার সালেহ আল-মোরাব্বাহ এই চমৎকার খবরটি জানান। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, এখন পর্যন্ত মোট ১৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫৩ জন বিদেশি হজযাত্রী নিরাপদে সৌদি আরবে এসে পৌঁছেছেন। আগামী সোমবার (২৫ মে) ৮ জিলহজ মিনায় অবস্থানের মধ্য দিয়ে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থানের মাধ্যমে পালিত হবে হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা প্রধান রোকন। যেহেতু এখনো দুদিন সময় বাকি, তাই এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর (২০২৫ সালে) সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ৩২০ জন হজ করেছিলেন, যার মধ্যে বিদেশি ছিলেন ১৫ লাখ ৬ হাজার ৫৭৬ জন। আর এবার মূল হজ শুরুর আগেই সেই সংখ্যা পার হয়ে যাওয়ায় এবারের হজ আয়োজন গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিশাল পরিসরের হতে যাচ্ছে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের থাকা-খাওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ও যাতায়াত সামলানো সৌদি প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ হলেও, সাধারণ মুসলিমদের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তের এত মানুষের এক হওয়াটা দারুণ এক আধ্যাত্মিক শান্তির বিষয়। এত বড় আয়োজনে লাখো মানুষের নিরাপত্তা যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য রীতিমতো নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে হজের পবিত্র স্থানগুলোকে। বিশেষ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল মনসুর বিন নাসের আল-ফায়েজ এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে থাকা বাহিনীর সদস্যদের কার্যক্রম ঘুরে দেখেছেন। তিনি জানিয়েছেন, হাজিদের সেবায় নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এবার শতভাগ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে। বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে এবার চমৎকার বোঝাপড়া ও সমন্বয় রয়েছে। এর ফলে আল্লাহর মেহমানরা কোনো রকম কষ্ট বা হয়রানি ছাড়া, সম্পূর্ণ নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের ইবাদত পালন করে নিজ নিজ দেশে ফিরতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বৃষ্টি মানেই অন্যরকম এক শান্তি। টিনের চালের ওপর টুপটাপ শব্দ, মাটির গন্ধ, গ্রামের কাঁচা রাস্তা আর ঠান্ডা বাতাস মানুষের মন নরম করে দেয়। ইসলামে বৃষ্টিকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। এটি আল্লাহর রহমত হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। তাই বৃষ্টির সময় কিছু বিশেষ আমল ও দোয়া করার কথা হাদিসে এসেছে। অনেকেই জানেন না, বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ইসলামিক স্কলাররা বলেন, এই সময় বান্দা যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ডাকে, তাহলে রহমত নাজিলের সঙ্গে সঙ্গে দোয়ার দরজাও খুলে যায়। বৃষ্টির সময় কিছু বিশেষ আমল, দোয়া ও জিকির করার কথা সহিহ হাদিসে এসেছে। আলেমগণ বলেন, এ সময় বান্দার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই একজন মুমিনের উচিত বৃষ্টির মুহূর্তগুলোকে ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণে কাজে লাগানো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ثِنْتَانِ مَا تُرَدَّانِ: الدُّعَاءُ عِنْدَ النِّدَاءِ، وَتَحْتَ الْمَطَرِ “দুটি দোয়া সাধারণত প্রত্যাখ্যান হয় না। আযানের সময়ের দোয়া এবং বৃষ্টির সময়ের দোয়া।” ( সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪০) ইমাম আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন এই হাদিস থেকে আলেমরা বলেন, বৃষ্টির সময় বেশি বেশি দোয়া করা মুস্তাহাব। বৃষ্টি শুরু হলে যে দোয়া পড়বেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টি দেখলে এই দোয়া পড়তেন: «اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا» উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাইয়িবান নাফিআ অর্থ: “হে আল্লাহ, এটিকে উপকারী বৃষ্টি বানিয়ে দিন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৩২) ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এই দোয়া পড়া সুন্নত এবং এতে বৃষ্টির বরকত কামনা করা হয়। বৃষ্টির পানি শরীরে লাগানো আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত: “আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। তখন বৃষ্টি শুরু হলো। তিনি তাঁর কাপড়ের কিছু অংশ সরিয়ে দিলেন যাতে বৃষ্টির পানি তাঁর শরীরে লাগে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এমন করলেন কেন? তিনি বললেন, কারণ এটি সদ্য তার রবের কাছ থেকে এসেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৮) ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এ হাদিস থেকে বোঝা যায় বৃষ্টির পানি বরকতময় এবং তা শরীরে লাগানো মুস্তাহাব। বৃষ্টির সময় ইস্তিগফার করা আল্লাহ তাআলা বলেন: فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا উচ্চারণ: ফাকুলতুস্তাগফিরু রব্বাকুম ইন্নাহু কানা গাফ্ফারা। ইউরসিলিস সামা’আ আলাইকুম মিদরারা। অর্থ: “আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন।” - সূরা নূহ, আয়াত: ১০-১১ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ইস্তিগফার আল্লাহর রহমত, রিজিক ও বৃষ্টির কারণ। বজ্রপাত ও ঝড়ো বাতাসের সময় দোয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঝড়ো বাতাস এলে বলতেন: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ» অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে এ বাতাসের কল্যাণ, এতে যা আছে তার কল্যাণ এবং যা নিয়ে এটি প্রেরিত হয়েছে তার কল্যাণ চাই। আর আমি এর অকল্যাণ, এতে যা আছে তার অকল্যাণ এবং যা নিয়ে এটি প্রেরিত হয়েছে তার অকল্যাণ থেকে আপনার আশ্রয় চাই।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৯) অতিবৃষ্টি হলে যে দোয়া পড়বেন যখন অতিরিক্ত বৃষ্টিতে কষ্ট হতো, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া পড়তেন: «اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا» অর্থ: “হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বৃষ্টি দিন, আমাদের ওপর নয়।” সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০১৪ , সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৭ বৃষ্টির সময় বেশি বেশি তাওবা ও জিকির ইসলামিক স্কলাররা বলেন, বৃষ্টির সময় তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির ও দরুদ শরিফ পড়া উত্তম। পড়তে পারেন: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ অর্থ: “আল্লাহ পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁর।” ইবনে হাজর আসকালানী (রহ.) বলেন: “বৃষ্টি আল্লাহর রহমতের নিদর্শন। তাই এ সময় ইবাদত ও দোয়ায় মনোযোগী হওয়া উচিত।” বৃষ্টির সময় দোয়া, ইস্তিগফার, তাওবা ও আল্লাহর স্মরণ করা সুন্নত ও বরকতময় আমল। সহিহ হাদিস ও কুরআনের আলোকে এ সময় ইবাদতে মনোযোগী হওয়া একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রহমতের এই মুহূর্তগুলোতেই অনেক সময় আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করে দেন। গ্রামবাংলায় এখনো অনেক মানুষ বৃষ্টি শুরু হলে “আলহামদুলিল্লাহ” বলেন। কৃষকেরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রহমতের বৃষ্টি কামনা করেন। কারণ বৃষ্টি শুধু আবহাওয়া না, এটি ফসল, জীবন আর বেঁচে থাকার সঙ্গেও জড়িত। তাই মুসলমানের জন্য বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য না, বরং আল্লাহকে স্মরণ করারও একটি বিশেষ সময়।
হজ মুসলিম নারীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে এটি শুধু আত্মিক সফর নয়, শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতিরও বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রচণ্ড গরম, ভিড়, হাঁটা, সময়সূচির পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে নারীদের জন্য আলাদা কিছু প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক নারী হজে যান। তাঁদের বড় একটি অংশ মধ্যবয়সী বা প্রবীণ। তাই আগেভাগে পরিকল্পনা করলে হজযাত্রা অনেক নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে। আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা কী বলছে ২০২৪ সালের হজ মৌসুমে সৌদি আরবে তীব্র তাপপ্রবাহে বহু হাজি অসুস্থ হন এবং শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে। তাপমাত্রা কিছু এলাকায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি পৌঁছায় বলে জানানো হয়। এ সময় অনেক নারী হাজিও হিট এক্সহসশন, পানিশূন্যতা, ক্লান্তি ও পথ হারানোর মতো সমস্যায় পড়েন। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মিশরের ষাটোর্ধ্ব এক নারী হাজি দীর্ঘ পথ হাঁটা ও অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে বিশ্রামের সময় স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরিবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর খোঁজ পাননি। ঘটনাটি দেখিয়েছে, ভিড় ও গরমে নারীদের জন্য দলছুট হওয়া কত বড় ঝুঁকি হতে পারে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোই বলছে, নারীদের প্রস্তুতি শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিকও হওয়া উচিত। স্বাস্থ্য পরীক্ষা আগে করানো জরুরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসকদের মতে, হজে যাওয়ার আগে নারীদের সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ভালো। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা, হাঁপানি, জয়েন্টের ব্যথা বা থাইরয়েড সমস্যা আছে, তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রবীণ নারীদের হাঁটার সক্ষমতা, হৃদরোগের ঝুঁকি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া দরকার। মাসিক সংক্রান্ত পরিকল্পনা জরুরি অনেক নারী হজের সময় মাসিক নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। চিকিৎসকদের মতে, কেউ যদি সময়সূচি নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তাহলে আগে থেকেই গাইনি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। নিজে নিজে হরমোন ট্যাবলেট খাওয়া উচিত নয়। কারণ এতে রক্তচাপ, মাথাব্যথা বা অন্যান্য জটিলতা হতে পারে। গরমে কীভাবে নিরাপদ থাকবেন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের জন্য হজে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পানিশূন্যতা। অনেকেই কম পানি পান করেন বা ক্লান্তি বুঝেও বিশ্রাম নেন না। তাই নিয়মিত পানি পান করতে হবে, ছাতা ব্যবহার করতে হবে, ভিড়ের সময় অতিরিক্ত চাপ এড়াতে হবে এবং দুর্বল লাগলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রাম নিতে হবে। হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক ও আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করলে চলাফেরা সহজ হয়। দলবদ্ধ থাকা সবচেয়ে নিরাপদ অভিজ্ঞ হাজিদের মতে, নারীদের একা চলাফেরা না করে দলের সঙ্গে থাকা ভালো। মোবাইলে হোটেলের লোকেশন, গ্রুপ লিডারের নম্বর এবং পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা উচিত। যদি পথ হারিয়ে ফেলেন, আতঙ্কিত না হয়ে নিকটস্থ সহায়তা বুথ বা নিরাপত্তাকর্মীর সাহায্য নিতে হবে। পোশাক ও আরামদায়ক সামগ্রী বেছে নিন হজের সময় দীর্ঘ হাঁটা ও গরমে আরামদায়ক, ঢিলেঢালা এবং শালীন পোশাক সবচেয়ে উপযোগী। এমন কাপড় পরা উচিত যা ঘাম শোষে এবং সহজে শুকায়। পায়ের জন্য নরম স্যান্ডেল বা আরামদায়ক জুতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী নতুন জুতা নিয়ে গিয়ে পরে ফোসকা বা ব্যথায় পড়েন। তাই আগে ব্যবহার করা আরামদায়ক জুতা নেওয়াই ভালো। ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখুন স্যানিটারি ন্যাপকিন, টিস্যু, সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, অতিরিক্ত ওড়না, পানির বোতল ও শুকনো খাবার আলাদা ব্যাগে রাখলে সুবিধা হয়। আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, হজে নারীদের বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে গরমে অসুস্থ হওয়া, দলছুট হওয়া, ক্লান্তি ও স্বাস্থ্য জটিলতা। তাই আগে থেকে সচেতন প্রস্তুতি নিলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, হজযাত্রী নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো সুস্থ শরীর, ধৈর্যশীল মন এবং সংগঠিত পরিকল্পনা। প্রস্তুতি ভালো হলে ইবাদতের সফরও হয় শান্ত ও স্বস্তিদায়ক।
By using this site, you agree to our Cookie Policy .