মানবজাতির ইতিহাসে কিছু জীবন আছে, যেগুলো শুধু একটি সময়কে বদলায় না, বরং যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন তেমনই এক অনন্য আলো। তিনি কোনো রাজপ্রাসাদে জন্ম নেননি, কোনো সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ছিলেন না। তিনি জন্মেছিলেন মক্কার মরুপ্রান্তরে, ইয়াতিম অবস্থায় বড় হয়েছেন, দারিদ্র্য দেখেছেন, উপহাস সহ্য করেছেন, প্রিয়জন হারিয়েছেন, তবু সত্যের দাওয়াত থেকে সরে যাননি।
যখন আরব সমাজ ছিল শিরক, অন্যায়, সুদ, নারী নির্যাতন, গোত্রবাদ ও রক্ত প্রতিশোধে ডুবে, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ এক, মানুষ সমান, জুলুম হারাম, সত্যই মুক্তির পথ। এই আহ্বানের কারণে তাঁকে পাথর মারা হয়েছে, সামাজিক বয়কট করা হয়েছে, মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন, শিয়াবে আবি তালিবে ক্ষুধা সহ্য করেছেন, কিন্তু মানবতার ডাক থামাননি।
মদিনায় হিজরতের পর তিনি শুধু ধর্মীয় নেতা নন, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক, শিক্ষক ও দয়ার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ২৩ বছরের সংগ্রামে তিনি বিভক্ত আরবকে এক উম্মাহতে রূপান্তরিত করেন।
তারপর এলো হিজরি দশম বছর। মহানবী (সা.) ঘোষণা দিলেন, তিনি হজ করবেন। লক্ষাধিক সাহাবী তাঁর সঙ্গে রওনা হলেন। অনেকেই অনুভব করছিলেন, এটি হয়তো প্রিয় নবীর শেষ হজ। ইতিহাসে সেটিই পরিচিত হলো হজ্জাতুল বিদা বা বিদায় হজ নামে।
সাহাবী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বের হলাম। চারদিক থেকে মানুষ আসছিল। কেউ সামনে, কেউ পেছনে, কেউ ডানে, কেউ বামে। সবাই নবীজির কাছ থেকে হজের বিধান শিখতে চায়, তাঁর প্রতিটি আমল অনুসরণ করতে চায়।
সহিহ মুসলিম, হাদিস (১২১৮)
সাহাবীদের মনে তখন আনন্দের সঙ্গে এক অদ্ভুত বেদনা কাজ করছিল। কারণ নবী (সা.) প্রতিটি কাজ এমনভাবে শেখাচ্ছিলেন, যেন বিদায়ের আগে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে যেতে চান।
৯ জিলহজ। আরাফার বিশাল প্রান্তর। সূর্যের তাপ, মরুর বাতাস, আর লক্ষাধিক সাহাবীর সমাবেশ। মহানবী (সা.) তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ প্রদান করেন। বিভিন্ন সহিহ হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে সংকলিত তাঁর ভাষণের মূল বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো।
তিনি বললেন,
হে মানুষ, তোমরা আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। কারণ আমি জানি না, এ বছরের পর আমি তোমাদের সঙ্গে এ স্থানে আর মিলিত হতে পারব কি না।
হে মানুষ, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য তেমনই পবিত্র, যেমন আজকের এই দিন পবিত্র, এই মাস পবিত্র, এই নগর পবিত্র।
সহিহ বুখারি (১৭৩৯)
জেনে রাখো, জাহেলি যুগের সব প্রথা আজ আমার পদতলে চূর্ণ হলো।
জাহেলি যুগের সব রক্ত প্রতিশোধ বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমাদের বংশের ইবনে রাবিয়ার রক্ত দাবি বাতিল করলাম।
জাহেলি যুগের সব সুদ বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সব সুদ বাতিল করলাম।
নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ। তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।
আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব।
সহিহ মুসলিম
হে মানুষ, তোমাদের প্রতিপালক একজন, তোমাদের পিতা একজন। সবাই আদম থেকে, আর আদম সৃষ্টি হয়েছেন মাটি থেকে।
কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সাদার ওপর কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কালোর ওপর সাদারও নেই। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ায়।
মুসলমান মুসলমানের ভাই। কারও সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা হালাল নয়।
যারা উপস্থিত আছ, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে আমার কথা পৌঁছে দেয়। কারণ যারা পরে শুনবে, তারা উপস্থিত অনেকের চেয়েও ভালোভাবে বুঝবে।
হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?
সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।
তখন তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে বললেন,
হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। সেই দিন আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন:
ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْهِكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَٰمَ دِينًا ۚ
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত ৩
হযরত উমর (রা.) বলতেন, আমরা জানি এ আয়াত কোন দিন নাজিল হয়েছিল। আরাফার দিন, জুমার দিন। এ আয়াত ছিল নবুওয়াতের মিশন পূর্ণতার ঘোষণা।
ভাষণের সময় বহু সাহাবীর চোখ ভিজে উঠেছিল। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, নবী (সা.) হয়তো শেষবারের মতো এত বড় সমাবেশে কথা বলছেন।
হযরত আবু বকর (রা.) ভাষণের কিছু অংশ শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এটি বিদায়ের ইঙ্গিত।
দেখুনঃ ডায়াবেটিক রোগীদের হজের প্রস্তুতি
বিদায় হজের কিছুদিন পর মহানবী (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বারবার নামাজের গুরুত্ব, মানুষের হক, দাসদাসীর অধিকার এবং উম্মাহর ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
এরপর রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। পৃথিবী হারায় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে, কিন্তু উম্মাহ পেয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ দ্বীন, কুরআন এবং সুন্নাহর আলো।
আজকের বিশ্বে হত্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি বাড়ছে। বিদায় হজ শেখায় মানুষের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
নবী (সা.) সুদ বাতিল করে অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
তিনি নারীদের আল্লাহর আমানত বলেছেন। এটি নারীর মর্যাদার স্পষ্ট ঘোষণা।
জাতি, ভাষা, গায়ের রঙ নয়, মর্যাদা নির্ধারিত হবে তাকওয়ায়।
উম্মাহর পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ।
এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর শেখানো পূর্ণাঙ্গ হজের বাস্তব রূপ। তিনি বলেছেন:
তোমরা তোমাদের হজের বিধান আমার কাছ থেকে শিখে নাও। (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ হজ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ত্যাগ, ঐক্য ও আনুগত্যের শিক্ষা।
মহানবী (সা.) রাজত্ব রেখে যাননি, রেখে গেছেন ন্যায়নীতি। ধনসম্পদ রেখে যাননি, রেখে গেছেন কুরআন। প্রাসাদ রেখে যাননি, রেখে গেছেন চরিত্রের সাম্রাজ্য।
আরাফার ময়দানে তাঁর সেই ভাষণ আজও মানবজাতির জন্য আলো। যদি মুসলিম উম্মাহ বিদায় হজের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে, তবে বিভক্তি থেকে ঐক্যে, অন্যায় থেকে ন্যায়ে, অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসা সম্ভব।
মৃত্যু - পৃথিবীর সবচেয়ে অমোঘ এবং সুনিশ্চিত সত্য। প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, এটি মহান আল্লাহর শাশ্বত ঘোষণা। কিন্তু মানুষের মনে যুগ যুগ ধরে একটি কৌতূহল বিরাজমান, মৃত্যুর পর আমাদের আত্মা বা রুহ কোথায় যায়? কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এই রহস্যের সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত সমাধান দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় যায়? ইসলামি দৃষ্টিতে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা ১. মৃত্যুর মুহূর্ত এবং রুহ কবজ করার প্রক্রিয়া মৃত্যুর সময় মানুষের কাছে মালাকুল মউত বা মৃত্যুর ফেরেশতা আসেন। মুমিনের কাছে তাঁরা আসেন জান্নাতের সুঘ্রাণ ও প্রশান্তি নিয়ে, আর পাপীদের কাছে আসেন ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। কোরআনের ঘোষণা: ۞ قُلْ يَتَوَفَّـٰكُم مَّلَكُ ٱلْمَوْتِ ٱلَّذِى وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ "বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অতঃপর তোমাদের রবের কাছেই তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।" (সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১১) ২. আলমে বারযাখ: অন্তর্বর্তীকালীন জগৎ মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আত্মা যে জগতে অবস্থান করে, ইসলামি পরিভাষায় তাকে 'বারযাখ' বলা হয়। এটি হলো দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যবর্তী একটি অন্তরায় বা পর্দা। কোরআনের ঘোষণা: لَعَلِّىٓ أَعْمَلُ صَـٰلِحًا فِيمَا تَرَكْتُۚ كَلَّآۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَآئِلُهَاۖ وَمِن وَرَآئِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ "আর তাদের সামনে বারযাখ (পর্দা বা অন্তরায়) থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।" (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ১০০) অর্থাৎ, মৃত্যুর পর আত্মা দুনিয়ায় ফিরে আসতে পারে না, বরং কিয়ামত পর্যন্ত এই বারযাখ জগতেই অবস্থান করে। ৩. মুমিনের আত্মা বনাম পাপীর আত্মা: গন্তব্য কোথায়? মৃত্যুর পর আত্মার গন্তব্য নিয়ে সুনানে আবু দাউদ (হাদিস নং: ৪৭৫৩) এবং মুসনাদে আহমাদ-এ হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে একটি দীর্ঘ ও বিখ্যাত সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই যাত্রার চমৎকার ও ভয়াবহ উভয় রূপই তুলে ধরেছেন: নেককার মুমিনের আত্মার গন্তব্য (ইল্লিয়্যিন): মুমিনের রুহ যখন বের করা হয়, তা সুগন্ধি ছড়াতে থাকে। ফেরেশতারা সম্মানের সাথে তা নিয়ে প্রথম আসমান থেকে সপ্তম আসমান পর্যন্ত যান। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের নির্দেশ দেন: "আমার বান্দার আমলনামা 'ইল্লিয়্যিন'-এ রেখে দাও এবং তাকে জমিনে তার শরীরে ফিরিয়ে দাও, কারণ আমি তাদের মাটি থেকেই সৃষ্টি করেছি।" কোরআনের ঘোষণা: كَلَّآ إِنَّ كِتَـٰبَ ٱلْأَبْرَارِ لَفِى عِلِّيِّي "কখনো নয়, নিশ্চয়ই পুণ্যবানদের আমলনামা ‘ইল্লিয়্যিন’-এ রয়েছে।" (সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৮) পাপী বা অবিশ্বাসী ব্যক্তির আত্মার গন্তব্য (সিজ্জিন): পাপীর রুহ বের করার সময় দুর্গন্ধ ছড়ায়। ফেরেশতারা তা নিয়ে আসমানের দিকে গেলে আসমানের দরজা তাদের জন্য খোলা হয় না। তখন আল্লাহ নির্দেশ দেন: "তার আমলনামা জমিনের সর্বনিম্নে 'সিজ্জিন'-এ রেখে দাও।" এরপর তার রুহকে সজোরে নিক্ষেপ করা হয়। কোরআনের ঘোষণা: كَلَّآ إِنَّ كِتَـٰبَ ٱلْفُجَّارِ لَفِى سِجِّي "কখনো নয়, নিশ্চয়ই পাপাচারীদের আমলনামা ‘সিজ্জিন’-এ রয়েছে।" (সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত: ৭) ৪. কবরের প্রশ্নোত্তর ও আত্মার অবস্থান আমলনামা ইল্লিয়্যিন বা সিজ্জিনে রাখার পর, রুহকে পুনরায় কবরে দেহের সাথে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় (যা আমাদের দুনিয়াবি কল্পনার বাইরে) যুক্ত করা হয়। এরপর মুনকার ও নাকির নামক দুই ফেরেশতা এসে তিনটি প্রশ্ন করেন: ১. তোমার রব কে? ২. তোমার দ্বীন কী? ৩. এই ব্যক্তি (রাসূল সা.) কে, যাঁকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল? মুমিন ব্যক্তি সঠিক উত্তর দিলে তার কবরকে প্রশস্ত করে জান্নাতের সাথে একটি জানালা খুলে দেওয়া হয়। আর পাপী ব্যক্তি উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে তার জন্য জাহান্নামের জানালা খুলে দেওয়া হয় এবং কবর তাকে এমনভাবে চেপে ধরে যে তার একদিকের পাঁজর অন্যদিকের পাঁজরে ঢুকে যায়। (সুনানে আত-তিরমিজি, হাদিস নং: ৩১২০, হাসান সহিহ) ৫. শহিদদের আত্মা কোথায় থাকে? সাধারণ মুমিনদের আত্মার চেয়ে শহিদদের আত্মার মর্যাদা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বারযাখ জগতেই সরাসরি জান্নাতের নেয়ামত ভোগ করতে থাকেন। সহিহ হাদিসের ঘোষণা: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, "শহিদদের আত্মাসমূহ জান্নাতে সবুজ রঙের পাখির পেটে অবস্থান করে। জান্নাতে ঝুলন্ত আরশের নিচে তাদের জন্য অনেকগুলো ঝাড়বাতি রয়েছে। তারা পুরো জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা বিচরণ করে এবং শেষে ওই ঝাড়বাতিগুলোতে ফিরে আসে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮৮৭) উপসংহার ও আমাদের শিক্ষণীয় বিষয় মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় যায় এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি দার্শনিক কৌতূহল মেটানোর জন্য নয়, বরং এটি আমাদের আখেরাতের প্রস্তুতির একটি সতর্কবার্তা। রুহ বের হওয়ার পরের অনন্ত যাত্রায় আমাদের সঙ্গী হবে কেবল আমাদের ঈমান ও নেক আমল। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে মৃত্যুর পর 'ইল্লিয়্যিন'-এ স্থান পাওয়ার তৌফিক দান করুন এবং কবরের আজাব থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
হজ ইসলামের অন্যতম মহান ইবাদত। এটি শুধু একটি সফর নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও নিয়মে সম্পন্ন করা আল্লাহর নির্দেশিত আমল। হজের কিছু কাজ ফরজ, কিছু ওয়াজিব, কিছু সুন্নত। অনেক হাজির সাধারণ প্রশ্ন হলো, হজের ওয়াজিব কয়টি এবং কোন কাজ বাদ গেলে কী করতে হয়। হজের ওয়াজিব কয়টি ইসলামি ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিশেষ করে হানাফি মাজহাবে হজের ৭টি প্রধান ওয়াজিব উল্লেখ করা হয়। এগুলোর কোনোটি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিলে দম অর্থাৎ পশু জবাই করতে হয়। তাই হজে যাওয়ার আগে বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি। ১. মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা যারা বাইরের দেশ বা এলাকা থেকে হজে যান, তাদের জন্য নির্ধারিত সীমারেখা বা মীকাত অতিক্রমের আগেই ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “এই মীকাতগুলো সেসব এলাকার মানুষের জন্য এবং যারা ওই পথ দিয়ে হজ ও উমরার ইচ্ছায় আসে তাদের জন্যও।” সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম অর্থাৎ মীকাত পার হয়ে পরে ইহরাম বাঁধা ঠিক নয়। করলে দম লাগতে পারে। ২. সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান হজের মূল অংশ। কেউ যদি দিনের বেলায় আরাফায় পৌঁছান, তাহলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকা ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরাফায় অবস্থান করে সূর্যাস্তের পর সেখান থেকে রওনা হন। এটি তাঁর সুন্নাহ এবং হজের নিয়ম। এ থেকে আলেমরা বলেন, সূর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করা ঠিক নয়। ৩. মুযদালিফায় রাত যাপন করা আরাফা থেকে ফেরার পর ৯ জিলহজ রাত মুযদালিফায় থাকা ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যখন তোমরা আরাফা থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশআরে হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করো।” (সূরা বাকারা: ১৯৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও মুযদালিফায় রাত কাটিয়েছেন এবং ফজরের পর দোয়া করেছেন। দুর্বল, নারী ও অসুস্থদের অর্ধরাতের পর বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ থেকেই বোঝা যায়, মূল বিধান হলো সেখানে রাত যাপন করা। ৪. তাশরীকের রাতগুলো মিনায় যাপন করা ১০ জিলহজের রাত, ১১ জিলহজের রাত এবং প্রয়োজনে ১২ জিলহজের রাত মিনায় থাকা ওয়াজিব। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনায় ফিরে এসে তাশরীকের রাতগুলো সেখানে কাটিয়েছেন। যারা হাজিদের পানি সরবরাহ বা বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছিল। এতে বোঝা যায় সাধারণ হাজিদের জন্য মিনায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব। ৫. জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা ১০ জিলহজ বড় জামরায় কঙ্কর মারা এবং ১১, ১২ জিলহজ তিন জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। যারা ১৩ তারিখ থাকবেন, তারাও ওই দিন কঙ্কর মারবেন। জাবির (রা.) বলেন: আমি নবী (সা.)-কে কুরবানির দিন বাহনের ওপর বসে কঙ্কর মারতে দেখেছি। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের হজের বিধান শিখে নাও। (সহিহ মুসলিম) ৬. মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট করা হজের নির্দিষ্ট কাজ শেষে পুরুষদের মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট করা ওয়াজিব। নারীরা চুলের সামান্য অংশ কাটবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মাথা মুন্ডনকারীদের জন্য তিনবার দোয়া করেছেন, আর চুল ছোটকারীদের জন্য একবার। এ থেকে বোঝা যায়, মাথা মুন্ডন অধিক উত্তম, তবে দুটোই বৈধ। ৭. বিদায়ী তাওয়াফ মক্কা ত্যাগের আগে বাইতুল্লাহর শেষ তাওয়াফ করা বহিরাগত হাজিদের জন্য ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: “কেউ যেন মক্কা ত্যাগ না করে, যতক্ষণ না তার শেষ কাজ হয় বাইতুল্লাহর তাওয়াফ।” (সহিহ মুসলিম) তবে ঋতুবতী নারীদের জন্য এ ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। কোনো ওয়াজিব বাদ গেলে কী হবে? হযরত ইবন আব্বাস (রা.) বলেন: “যে ব্যক্তি হজের কোনো কাজ ভুলে যায় অথবা ছেড়ে দেয়, সে যেন একটি পশু জবাই করে।” এ কারণে ফকিহরা বলেন, হজের ওয়াজিব বাদ গেলে দম দিতে হয়। দম বলতে হারাম এলাকার মধ্যে নির্ধারিত পশু কোরবানি বোঝায়। অনেক হাজি হজে গিয়ে বুঝতে পারেন না কোন কাজ ফরজ, কোনটি ওয়াজিব, কোনটি সুন্নত। ফলে অজান্তেই ভুল হয়ে যায়। ঢাকা ও বাংলাদেশের আলেমরা পরামর্শ দেন, হজে যাওয়ার আগে প্রশিক্ষণ কোর্স করা, বই পড়া এবং নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে মাসআলা শিখে নেওয়া উচিত। উপলব্ধি হজের ওয়াজিব কয়টি প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, প্রচলিত হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ৭টি প্রধান ওয়াজিব রয়েছে। এগুলো হজের সৌন্দর্য ও পূর্ণতা নিশ্চিত করে। তাই হজে যাওয়ার আগে শুধু টিকিট ও ব্যাগ প্রস্তুত করলেই হবে না, মাসআলা শেখাও জরুরি। কারণ সঠিক জ্ঞান ছাড়া সফর হয়, কিন্তু সঠিক জ্ঞান থাকলে হজ কবুলের আশা বাড়ে।
আগামী বছর থেকে হজের খরচ আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হজযাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি আরও ভালো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার, যাতে আগামী বছর থেকে হজযাত্রীদের কষ্ট আরও কম হয়।’ শুক্রবার রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ বছরের প্রথম হজ ফ্লাইট উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর পরপরই রাত ১২টা ২০ মিনিটে ৪১৮ জন হজযাত্রী নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রথম ফ্লাইটটি সৌদি আরবের জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের সীমাবদ্ধতা ও প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমরা গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেছি। অথচ এবারের হজের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের হাতে খুব বেশি সময় বা সুযোগ ছিল না। তারপরও আমরা চেষ্টা করেছি যতটুকু করা যায়। এবার হজের খরচ আমরা ১২ হাজার টাকার মতো কমাতে পেরেছি।’ হজযাত্রীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা পবিত্র আল্লাহর ঘরে যাচ্ছেন। দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য দোয়া করবেন, যাতে সবাই শান্তিতে থাকতে পারে। আমি দোয়া করি, আপনারা যেন সুস্বাস্থ্য নিয়ে হজ পালন করে সুস্থভাবে দেশে ফিরতে পারেন।’ হজ ফ্লাইট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়াহসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ বছর সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ পবিত্র হজ পালনে যাচ্ছেন। হজযাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্স বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
By using this site, you agree to our Cookie Policy .