আপনার উপর কি কোরবানি ওয়াজিব হয়েছে? ইসলাম কী বলে

দিগন্ত প্রতিবেদন
দিগন্ত প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৬ | রাত ১১:৫৬
কুরবানি ঈদ

ঈদুল আজহা আসলেই অনেকের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরতে থাকে, “আমার উপর কি কোরবানি ওয়াজিব?” কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন, আবার কেউ পরিবারে নির্ভরশীল। ফলে কে কোরবানি দেবেন আর কার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, এই বিষয়টি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি দেখা যায়।

ইসলামিক স্কলারদের মতে, কোরবানি মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু পশু জবাই না, বরং ত্যাগ, তাকওয়া এবং সামর্থ্যের পরীক্ষা।

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোরবানি ওয়াজিব। অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করলে গুনাহ হবে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।” - সূত্র: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩

অনেক মুহাদ্দিস হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।

কোরবানি কাদের উপর ওয়াজিব

ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, যেসব মুসলমানের মধ্যে নিচের শর্তগুলো পাওয়া যাবে, তাদের উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। প্রথমত তিনি মুসলিম হতে হবে।দ্বিতীয়ত তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে। তৃতীয়ত তিনি মুসাফির না হয়ে নিজ এলাকায় অবস্থানকারী হতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এমন সম্পদ থাকতে হবে, যা নেসাব পরিমাণে পৌঁছে।

নেসাব পরিমাণ সম্পদ বলতে কী বোঝায়

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কারও কাছে যদি সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়।

এই সম্পদের মধ্যে থাকতে পারে: নগদ টাকা, স্বর্ণ বা রূপা, ব্যবসার পণ্য, সঞ্চয়, অতিরিক্ত জমি। তবে বসবাসের ঘর, ব্যবহারিক আসবাবপত্র বা প্রয়োজনীয় গাড়ি সাধারণত নেসাবের হিসেবে ধরা হয় না।

নারীদের উপর কি কোরবানি ওয়াজিব

অনেকেই মনে করেন কোরবানি শুধু পুরুষদের জন্য। কিন্তু ইসলামি বিধান অনুযায়ী, সামর্থ্য থাকলে নারীদের উপরও কোরবানি ওয়াজিব হতে পারে।

যদি কোনো নারীর নিজের স্বর্ণালংকার, সঞ্চয় বা সম্পদ নেসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তাহলে তার উপরও কোরবানি ওয়াজিব হবে।

এ বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ, আল আজহারসহ বিভিন্ন ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের আলেমরা একই মত প্রকাশ করেছেন।

প্রশ্নঃ বাবা জীবিত থাকলে সন্তানের উপর কোরবানি হবে?

এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলোর একটি।

ইসলামে প্রত্যেক ব্যক্তির কোরবানি তার নিজের সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাবা ধনী হলেই সন্তানের উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। আবার সন্তান উপার্জনক্ষম ও নেসাবের মালিক হলে বাবার সঙ্গে থাকলেও তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হতে পারে। আরো স্পষ্ট তথ্যের জন্য একজন অভিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হবেন। 

আপনি আর্থিকভাবে ঋণী হলে কোরবানি ওয়াজিব নয়

যদি কারও ওপর এমন ঋণ থাকে যা পরিশোধ করার পর তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। ইসলামিক স্কলাররা বলেন, ইসলাম কখনো মানুষের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে না।

কোরবানির গুরুত্ব কেন এত বেশি যে কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম না। কোরআনে আল্লাহ বলেন:

আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” সূরা আল হাজ্জ, আয়াত: ৩৭

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা।

কোরবানি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস

  • নিজের সম্পদের হিসাব আগে থেকেই মিলিয়ে নিন
  • ঋণ ও প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে নেসাব নির্ধারণ করুন
  • শুধু লোক দেখানোর জন্য কোরবানি করবেন না
  • পশু কেনার আগে সুস্থতা যাচাই করুন
  • কোরবানির মাংস আত্মীয় ও গরিবদের মাঝে ভাগ করে দিন

কোরবানি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হলো সমাজের চাপে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনেকে ধার করে বা কষ্ট করে শুধু মানুষের কথা ভেবে কোরবানি দেন, আবার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ অবহেলা করেন। অথচ ইসলাম ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। তাই কোরবানি আপনার ওপর ওয়াজিব কি না, সেটি আবেগ দিয়ে না, বরং সহিহ মাসআলা ও আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

ধর্ম থেকে আরো

আরো দেখুন
কুরবানি ঈদ
আপনার উপর কি কোরবানি ওয়াজিব হয়েছে? ইসলাম কী বলে

ঈদুল আজহা আসলেই অনেকের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরতে থাকে, “আমার উপর কি কোরবানি ওয়াজিব?” কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন, আবার কেউ পরিবারে নির্ভরশীল। ফলে কে কোরবানি দেবেন আর কার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, এই বিষয়টি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি দেখা যায়। ইসলামিক স্কলারদের মতে, কোরবানি মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু পশু জবাই না, বরং ত্যাগ, তাকওয়া এবং সামর্থ্যের পরীক্ষা। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোরবানি ওয়াজিব। অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করলে গুনাহ হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।” - সূত্র: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩ অনেক মুহাদ্দিস হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। কোরবানি কাদের উপর ওয়াজিব ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, যেসব মুসলমানের মধ্যে নিচের শর্তগুলো পাওয়া যাবে, তাদের উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। প্রথমত তিনি মুসলিম হতে হবে।দ্বিতীয়ত তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে। তৃতীয়ত তিনি মুসাফির না হয়ে নিজ এলাকায় অবস্থানকারী হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এমন সম্পদ থাকতে হবে, যা নেসাব পরিমাণে পৌঁছে। নেসাব পরিমাণ সম্পদ বলতে কী বোঝায় হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কারও কাছে যদি সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। এই সম্পদের মধ্যে থাকতে পারে: নগদ টাকা, স্বর্ণ বা রূপা, ব্যবসার পণ্য, সঞ্চয়, অতিরিক্ত জমি। তবে বসবাসের ঘর, ব্যবহারিক আসবাবপত্র বা প্রয়োজনীয় গাড়ি সাধারণত নেসাবের হিসেবে ধরা হয় না। নারীদের উপর কি কোরবানি ওয়াজিব অনেকেই মনে করেন কোরবানি শুধু পুরুষদের জন্য। কিন্তু ইসলামি বিধান অনুযায়ী, সামর্থ্য থাকলে নারীদের উপরও কোরবানি ওয়াজিব হতে পারে। যদি কোনো নারীর নিজের স্বর্ণালংকার, সঞ্চয় বা সম্পদ নেসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তাহলে তার উপরও কোরবানি ওয়াজিব হবে। এ বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ, আল আজহারসহ বিভিন্ন ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের আলেমরা একই মত প্রকাশ করেছেন। প্রশ্নঃ বাবা জীবিত থাকলে সন্তানের উপর কোরবানি হবে? এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলোর একটি। ইসলামে প্রত্যেক ব্যক্তির কোরবানি তার নিজের সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাবা ধনী হলেই সন্তানের উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। আবার সন্তান উপার্জনক্ষম ও নেসাবের মালিক হলে বাবার সঙ্গে থাকলেও তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হতে পারে। আরো স্পষ্ট তথ্যের জন্য একজন অভিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হবেন।  আপনি আর্থিকভাবে ঋণী হলে কোরবানি ওয়াজিব নয় যদি কারও ওপর এমন ঋণ থাকে যা পরিশোধ করার পর তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। ইসলামিক স্কলাররা বলেন, ইসলাম কখনো মানুষের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে না। কোরবানির গুরুত্ব কেন এত বেশি যে কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম না। কোরআনে আল্লাহ বলেন: “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” সূরা আল হাজ্জ, আয়াত: ৩৭ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা। কোরবানি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস নিজের সম্পদের হিসাব আগে থেকেই মিলিয়ে নিন ঋণ ও প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে নেসাব নির্ধারণ করুন শুধু লোক দেখানোর জন্য কোরবানি করবেন না পশু কেনার আগে সুস্থতা যাচাই করুন কোরবানির মাংস আত্মীয় ও গরিবদের মাঝে ভাগ করে দিন কোরবানি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হলো সমাজের চাপে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনেকে ধার করে বা কষ্ট করে শুধু মানুষের কথা ভেবে কোরবানি দেন, আবার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ অবহেলা করেন। অথচ ইসলাম ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। তাই কোরবানি আপনার ওপর ওয়াজিব কি না, সেটি আবেগ দিয়ে না, বরং সহিহ মাসআলা ও আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

দিগন্ত প্রতিবেদন ১৩ মে, ২০২৬ 0
বৃষ্টির সময় যে আমলগুলো করবেন

বৃষ্টির সময় যে আমলগুলো করবেন

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া ও ফজিলত

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া ও ফজিলত

হজের ওয়াজিব কয়টি

হজের ওয়াজিব কয়টি? হজে যাওয়ার আগে জানুন

বিদায় হজ্জের ভাষণ: মহানবী (সা.)-এর শেষ ঐতিহাসিক বাণী
বিদায় হজ্জের ভাষণ, মহানবী (সা.) এর শেষ ঐতিহাসিক বাণী

মানবজাতির ইতিহাসে কিছু জীবন আছে, যেগুলো শুধু একটি সময়কে বদলায় না, বরং যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন তেমনই এক অনন্য আলো। তিনি কোনো রাজপ্রাসাদে জন্ম নেননি, কোনো সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ছিলেন না। তিনি জন্মেছিলেন মক্কার মরুপ্রান্তরে, ইয়াতিম অবস্থায় বড় হয়েছেন, দারিদ্র্য দেখেছেন, উপহাস সহ্য করেছেন, প্রিয়জন হারিয়েছেন, তবু সত্যের দাওয়াত থেকে সরে যাননি। যখন আরব সমাজ ছিল শিরক, অন্যায়, সুদ, নারী নির্যাতন, গোত্রবাদ ও রক্ত প্রতিশোধে ডুবে, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ এক, মানুষ সমান, জুলুম হারাম, সত্যই মুক্তির পথ। এই আহ্বানের কারণে তাঁকে পাথর মারা হয়েছে, সামাজিক বয়কট করা হয়েছে, মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন, শিয়াবে আবি তালিবে ক্ষুধা সহ্য করেছেন, কিন্তু মানবতার ডাক থামাননি। মদিনায় হিজরতের পর তিনি শুধু ধর্মীয় নেতা নন, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক, শিক্ষক ও দয়ার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ২৩ বছরের সংগ্রামে তিনি বিভক্ত আরবকে এক উম্মাহতে রূপান্তরিত করেন। তারপর এলো হিজরি দশম বছর। মহানবী (সা.) ঘোষণা দিলেন, তিনি হজ করবেন। লক্ষাধিক সাহাবী তাঁর সঙ্গে রওনা হলেন। অনেকেই অনুভব করছিলেন, এটি হয়তো প্রিয় নবীর শেষ হজ। ইতিহাসে সেটিই পরিচিত হলো হজ্জাতুল বিদা বা বিদায় হজ নামে। বিদায় হজের পথে মহানবী সাঃ এর আবেগঘন যাত্রা সাহাবী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বের হলাম। চারদিক থেকে মানুষ আসছিল। কেউ সামনে, কেউ পেছনে, কেউ ডানে, কেউ বামে। সবাই নবীজির কাছ থেকে হজের বিধান শিখতে চায়, তাঁর প্রতিটি আমল অনুসরণ করতে চায়। সহিহ মুসলিম, হাদিস (১২১৮)  সাহাবীদের মনে তখন আনন্দের সঙ্গে এক অদ্ভুত বেদনা কাজ করছিল। কারণ নবী (সা.) প্রতিটি কাজ এমনভাবে শেখাচ্ছিলেন, যেন বিদায়ের আগে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে যেতে চান। আরাফার ময়দানে বিদায় হজ্জের ভাষণ  ৯ জিলহজ। আরাফার বিশাল প্রান্তর। সূর্যের তাপ, মরুর বাতাস, আর লক্ষাধিক সাহাবীর সমাবেশ। মহানবী (সা.) তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ প্রদান করেন। বিভিন্ন সহিহ হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে সংকলিত তাঁর ভাষণের মূল বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো। তিনি বললেন, হে মানুষ, তোমরা আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। কারণ আমি জানি না, এ বছরের পর আমি তোমাদের সঙ্গে এ স্থানে আর মিলিত হতে পারব কি না। হে মানুষ, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য তেমনই পবিত্র, যেমন আজকের এই দিন পবিত্র, এই মাস পবিত্র, এই নগর পবিত্র। সহিহ বুখারি (১৭৩৯)  জেনে রাখো, জাহেলি যুগের সব প্রথা আজ আমার পদতলে চূর্ণ হলো। জাহেলি যুগের সব রক্ত প্রতিশোধ বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমাদের বংশের ইবনে রাবিয়ার রক্ত দাবি বাতিল করলাম। জাহেলি যুগের সব সুদ বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সব সুদ বাতিল করলাম। নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ। তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব। সহিহ মুসলিম হে মানুষ, তোমাদের প্রতিপালক একজন, তোমাদের পিতা একজন। সবাই আদম থেকে, আর আদম সৃষ্টি হয়েছেন মাটি থেকে। কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সাদার ওপর কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কালোর ওপর সাদারও নেই। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ায়। মুসলমান মুসলমানের ভাই। কারও সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা হালাল নয়। যারা উপস্থিত আছ, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে আমার কথা পৌঁছে দেয়। কারণ যারা পরে শুনবে, তারা উপস্থিত অনেকের চেয়েও ভালোভাবে বুঝবে। হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন। তখন তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে বললেন, হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। সেই দিন আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন: ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْهِكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَٰمَ دِينًا ۚ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত ৩ হযরত উমর (রা.) বলতেন, আমরা জানি এ আয়াত কোন দিন নাজিল হয়েছিল। আরাফার দিন, জুমার দিন। এ আয়াত ছিল নবুওয়াতের মিশন পূর্ণতার ঘোষণা। সাহাবীদের চোখে বিদায়ের আভাস ভাষণের সময় বহু সাহাবীর চোখ ভিজে উঠেছিল। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, নবী (সা.) হয়তো শেষবারের মতো এত বড় সমাবেশে কথা বলছেন। হযরত আবু বকর (রা.) ভাষণের কিছু অংশ শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এটি বিদায়ের ইঙ্গিত। দেখুনঃ ডায়াবেটিক রোগীদের হজের প্রস্তুতি বিদায় হজের পরের প্রেক্ষাপট বিদায় হজের কিছুদিন পর মহানবী (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বারবার নামাজের গুরুত্ব, মানুষের হক, দাসদাসীর অধিকার এবং উম্মাহর ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। পৃথিবী হারায় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে, কিন্তু উম্মাহ পেয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ দ্বীন, কুরআন এবং সুন্নাহর আলো। বিদায় হজের মূল শিক্ষা ১. মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান পবিত্র আজকের বিশ্বে হত্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি বাড়ছে। বিদায় হজ শেখায় মানুষের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। ২. সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি নবী (সা.) সুদ বাতিল করে অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ৩. নারী সম্মান ও পারিবারিক ন্যায় তিনি নারীদের আল্লাহর আমানত বলেছেন। এটি নারীর মর্যাদার স্পষ্ট ঘোষণা। ৪. বর্ণবাদহীন সমাজ জাতি, ভাষা, গায়ের রঙ নয়, মর্যাদা নির্ধারিত হবে তাকওয়ায়। ৫. কুরআন আঁকড়ে ধরা উম্মাহর পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ। বিদায় হজের ফজিলত এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর শেখানো পূর্ণাঙ্গ হজের বাস্তব রূপ। তিনি বলেছেন: তোমরা তোমাদের হজের বিধান আমার কাছ থেকে শিখে নাও। (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ হজ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ত্যাগ, ঐক্য ও আনুগত্যের শিক্ষা। উপলব্ধি মহানবী (সা.) রাজত্ব রেখে যাননি, রেখে গেছেন ন্যায়নীতি। ধনসম্পদ রেখে যাননি, রেখে গেছেন কুরআন। প্রাসাদ রেখে যাননি, রেখে গেছেন চরিত্রের সাম্রাজ্য। আরাফার ময়দানে তাঁর সেই ভাষণ আজও মানবজাতির জন্য আলো। যদি মুসলিম উম্মাহ বিদায় হজের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে, তবে বিভক্তি থেকে ঐক্যে, অন্যায় থেকে ন্যায়ে, অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসা সম্ভব।

ডেস্ক রিপোর্ট ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ 0
হজযাত্রী নারীদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত

হজযাত্রী নারীদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত

বছরের প্রথম হজ ফ্লাইট উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

বছরের প্রথম হজ ফ্লাইট উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

আগামী বছর হজের খরচ আরও কমানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

আগামী বছর হজের খরচ আরও কমানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

জুমার নামাজের পর যে আমল গুলো করবেন
জুমার নামাজের পর যে আমল গুলো করবেন

ইসলামিক পরিভাষায় জুমার দিনকে বলা হয় ‘ইয়াউমুল জুমা’ বা সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বরকতময় ও সাপ্তাহিক ঈদের দিন। মহান আল্লাহ তাআলা এই দিনটিকে অন্যান্য দিনের তুলনায় বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। জুমার নামাজের গুরুত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন। সূরা আল-জুমার ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন: يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا نُودِىَ لِلصَّلَوٲةِ مِن يَوْمِ ٱلْجُمُعَةِ فَٱسْعَوْاْ إِلَىٰ ذِكْرِ ٱللَّهِ وَذَرُواْ ٱلْبَيْعَ‌ۚ ذَٲلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ "হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ধাবিত হও এবং কেনাবেচা বন্ধ করো। এটিই তোমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ, যদি তোমরা বুঝতে পারো।" (সূরা আল-জুমা, আয়াত: ৯) এই আয়াতের মাধ্যমে জুমার নামাজের সময় পার্থিব কাজ ত্যাগ করে মসজিদে উপস্থিত হওয়া প্রত্যেক মুসলিম পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক বা ফরজ করা হয়েছে। হাদিসের আলোকে জুমার ফজিলত রাসূলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, "সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিনই হলো শ্রেষ্ঠ দিন। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫৪) অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে গোসল ও পবিত্রতা অর্জন করে জুমার নামাজে অংশ নেয় এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সমস্ত (সগিরা) গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৮৮৩) জুমার নামাজের পর যে আমল গুলো করবেন জুমার নামাজের পরবর্তী সময়টুকু অত্যন্ত বরকতময়। এই সময়ে করার মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো হাদিসের উদ্ধৃতিসহ নিচে দেওয়া হলো: ১. তিন সূরা পাঠের বিশেষ আমল জুমার নামাজের পর তায়াম্মুম বা ওজু অবস্থায় অন্য কোনো কথা বলার আগে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস—প্রতিটি ৭ বার করে পাঠ করা। ফজিলত: যে ব্যক্তি এই আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত যাবতীয় অনিষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবেন। (সূত্র: ইবনুস সুন্নি, হাদিস নং: ৩৭৪; আল-আজকার, ইমাম নববী) ২. আসরের পর দোয়া কবুলের সময় জুমার নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টি দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আসরের শেষ সময়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করা। হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, কোনো মুসলিম যদি সেই সময়ে দাঁড়িয়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তবে আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দান করেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫৩) ৩. ৮০ বছরের গুনাহ মাফের দরুদ জুমার দিন আসরের নামাজের পর নিজের স্থান থেকে ওঠার আগে ৮০ বার এই দরুদটি পাঠ করা: "আল্লাহুম্মা সাললি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলা আলিহি ওয়াসাল্লিম তাসলিমা।" ফজিলত: যে ব্যক্তি এই আমল করবে, তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ করা হবে এবং ৮০ বছরের ইবাদতের সওয়াব আমলনামায় লেখা হবে। (সূত্র: আল-জামি আস-সগির, হাদিস নং: ৬৩৫৮; দারা কুতনি) ৪. সূরা কাহাফ তিলাওয়াত (যদি আগে পড়া না হয়) যারা জুমার নামাজের আগে সূরা কাহাফ পড়তে পারেননি, তারা নামাজের পর সূর্যাস্তের আগে এটি পড়ে নিতে পারেন। হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত বিশেষ নূর বা আলো চমকাতে থাকবে।" (সুনানে বায়হাকি, হাদিস নং: ২৪৪১; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস নং: ৩৩৪৯) ৫. জুমার পরবর্তী সুন্নত নামাজ জুমার ফরজের পর মসজিদে ৪ রাকাত (২ রাকাত করে) এবং বাড়িতে গিয়ে ২ রাকাত নামাজ পড়া সুন্নাহ। হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন জুমার নামাজ পড়ে, সে যেন এরপর চার রাকাত নামাজ পড়ে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮৮১) জুমার নামাজের পর দুনিয়াবী অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় লিপ্ত না হয়ে এই জিকির ও আমলগুলোর মাধ্যমে দিনটিকে সার্থক করে তোলা প্রতিটি মুমিনের উচিত। উপসংহার জুমার নামাজ পরবর্তী সময়টি কেবল বিশ্রামের নয়, বরং জিকির ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। নামাজের পর সাতবার করে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করা এবং ওজু অবস্থায় জিকিরে মগ্ন থাকা মুমিনের জন্য সুরক্ষাস্বরূপ। তাই ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্য জুমার দিনের এই বরকতময় সময়গুলোকে কাজে লাগানো প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।

ডিপি প্রতিবেদন ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ 0
গ্রাফিকঃ দিগন্ত পোস্ট

হজের খরচ কমানো নিয়ে সুখবর দিলেন ধর্মমন্ত্রী!

ছবিঃ ইন্টারনেট

কবে থেকে শুরু হচ্ছে এবারের হজ ফ্লাইট? যা জানালেন ধর্মমন্ত্রী

ছবিঃ পিক্সাবেই

রোজা রেখে রক্ত দেওয়া যাবে কি?