সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের সংখ্যা চার লাখের সমান। বর্তমানে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা "জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫" অনুযায়ী বেতন পান। জানার বিষয় হলো একজন শিক্ষক যিনি শিক্ষাদান করেন তিনি কি পরিমান টাকা বেতন হিসেবে পান। তবে বাস্তবতা হলো এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের বেতন সংক্রান্ত নানান বৈষম্য নিয়ে প্রতিনিয়ত বর্তমানে সরকারের নিকট আন্দোলন চলমান। জানা যাক এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কত। অর্থাৎ একজন এমপিওভুক্ত স্কুল বা কলেজের শিক্ষকের বেতন কত টাকা এবং বেতনের পাশাপাশি অন্যান্য কি সুযোগ-সুবিধা পান।
এমপিও (MPO) হলো Monthly Pay Order। এটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (যেমন: স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক ভিত্তিতে বেতন-ভাতা প্রদানের একটি প্রক্রিয়া। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও কর্মচারীরা সরকার থেকে মূল বেতনের শতভাগ এবং কিছু নির্দিষ্ট ভাতা পেয়ে থাকেন।
যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার ঘোষিত অর্থাৎ সরকারি তালিকাভুক্ত সেই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলা হয়, এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি শিক্ষক নিয়োজিত থাকেন । তবে মনে রাখা ভালো সব শিক্ষকই এমপিও ভুক্ত নন। অর্থাৎ একজন শিক্ষককে এমপিও ভুক্ত হতে হলে NTRCA নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।
কিন্তু একটা জিনিস অবশ্যই আপনাকে মনে রাখতে হবে , এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং একজন একজন সম্পূর্ণ সরকারি শিক্ষক এক নন। সম্পূর্ণ সরকারি শিক্ষকরা সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ বেতন-ভাতা পান এবং তাদের প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে সরকারি। অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হলেও সরকারের কাছ থেকে আংশিক আর্থিক সহায়তা পান। আর এই বৈষম্যের কারণেই সর্বশেষ এমপিও ভুক্ত শিক্ষকরা বেতন ভাতা নিয়ে বৈষম্য দূর করার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েছেন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কাঠামো তাদের পদের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় বেতন স্কেলের বিভিন্ন গ্রেডে নির্ধারিত হয়।
| পদের নাম | গ্রেড | মূল বেতন স্কেল (টাকায়) |
| সহকারী শিক্ষক (বি.এড) | গ্রেড ১১ | ১২,৫০০ - ৩০,২৩০ |
| সহকারী শিক্ষক (বি.এড ছাড়া) | গ্রেড ১২ | ১১,৩০০ - ২৭,৩০০ |
| সিনিয়র শিক্ষক (১০ বছর পূর্তিতে) | গ্রেড ১০ | ১৬,০০০ - ৩৮,৬৪০ |
| সহকারী প্রধান শিক্ষক / সহকারী সুপার | গ্রেড ৯ | ২২,০০০ - ৫৩,০৬০ |
| প্রধান শিক্ষক / সুপার | গ্রেড ৭ | ২৯,০০০ - ৬৩,৪১০ |
দ্রষ্টব্য: উচ্চতর গ্রেড (সাধারণত ৬ষ্ঠ গ্রেড) পাওয়ার সুযোগও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে রয়েছে।
| পদের নাম | গ্রেড | মূল বেতন স্কেল (টাকায়) |
| প্রভাষক | গ্রেড ৯ | ২২,০০০ - ৫৩,০৬০ |
| সহকারী অধ্যাপক (পদোন্নতিতে) | গ্রেড ৭ | ২৯,০০০ - ৬৩,৪১০ |
| সহযোগী অধ্যাপক | গ্রেড ৬ | ৩৫,৫০০ - ৬৭,০১০ |
| অধ্যক্ষ | গ্রেড ৫ / ৪ | ৪৩,০০০ - ৬৯,৮৫০ / ৫০,০০০ - ৭১,২০০ |
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ভাতা পান, যা সরকারি চাকরিজীবীদের থেকে ভিন্ন:
প্রতি মাসে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতন থেকে মোট ১০% অর্থ কর্তন করা হয়, যা তাদের অবসরকালীন সুবিধার জন্য জমা থাকে।
অবসর সুবিধা বোর্ড মূল বেতনের ৬%।
কল্যাণ ট্রাস্ট: মূল বেতনের ৪%।

যদিও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের সাথে সরকারি শিক্ষকদের বেতন এবং ভাতার ক্ষেত্রে বেশ পার্থক্য রয়েছে। এটি দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষকদের মাঝে আলোচনার বিষয়। সরকারি শিক্ষকরা বাড়ি ভাড়া হিসেবে পান মূল বেতনের ওপর নির্দিষ্ট হারে (শহর বা গ্রাম ভেদে ৪০-৬০%), যেখানে এমপিওভুক্তরা পান ফিক্সড ১,০০০ টাকা। চিকিৎসা ভাতা হিসেবে পান ফিক্সড ১,৫০০ টাকা, যেখানে এমপিওভুক্তরা পান ফিক্সড ৫০০ টাকা। অন্যদিকে উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের ১০০%, যেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পান মাত্র ২৫%।
এই পার্থক্যগুলো নিরসনের দাবিতে এবং শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করে আসছেন। সর্বশেষে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জাতীয় পে কমিশনের সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে মতবিনিময় করেছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সংগঠন- এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের প্রতিনিধিদল। তারা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সর্বনিম্ন বেতন ৩০ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ বেতন এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা করাসহ ১০ দাবি প্রস্তাব দিয়েছেন।
বর্তমানে সারাদেশে শিক্ষকতা পেশায় আলোচনার তুঙ্গে হল জাতীয় পে স্কেল ২০২৫ বাস্তবায়ন। আর এই আদেশ অনুযায়ী এবং বর্তমান প্রচলিত স্কেল অনুযায়ী বেতন ভাতা কেমন অনেকেই জানে না। অনেকেই চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে এই প্রশ্নটা ঠিকমতো জেনে নেন না, পরে হতাশ হন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বেতনকাঠামো আসলে নির্দিষ্ট, শুধু পদ বুঝে হিসাবটা মেলাতে হবে। চলুন দেখে আসি এমপিওভুক্ত কলেজ শিক্ষকদের বেতন কত। এমপিও মানে হলো Monthly Payment Order। বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১ অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ মোতাবেক বেতন পান। প্রতি মাসে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অংশ পরিশোধ করা হয়। এমপিওভুক্ত কলেজ শিক্ষকদের বেতন কত? বর্তমানে একজন নতুন প্রভাষকের মূল বেতন শুরু হয় ২২ হাজার টাকা থেকে, যা নবম গ্রেডের অন্তর্ভুক্ত। সহকারী অধ্যাপকেরা ষষ্ঠ গ্রেডে পান ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা। আর অধ্যক্ষদের বেতন প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। মূল বেতনের সাথে যোগ হয় বাড়িভাড়া ভাতা ১,০০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। উৎসব ভাতা হিসেবে এখন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে দুই ঈদে দুটি ভাতা পেয়ে থাকেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা, এছাড়া বৈশাখী ভাতাও আছে। ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি কলেজের এক প্রভাষক জানিয়েছেন, চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ভেবেছিলেন বেতন আরও বেশি হবে। পরে বুঝেছেন, মূল বেতনের বাইরে বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে মাস শেষে হাতে যা আসে সেটা দিয়ে ঢাকায় সংসার চালানো বেশ কষ্টকর। এবার আসা যাক সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে। নবম পে স্কেল ২০২৫ নিয়ে শিক্ষক মহলে এখন তুমুল আলোচনা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনায় জানা গেছে, নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতন শতভাগ বাড়বে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোট গত অক্টোবরে পে কমিশনের সাথে মতবিনিময়ে তাদের প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩০ হাজার এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করতে হবে। প্রস্তাবিত গ্রেড অনুযায়ী একজন প্রভাষকের জন্য গ্রেড-৯-এ ৫৫ হাজার, সহকারী অধ্যাপকের গ্রেড-৬-এ ৮০ হাজার এবং অধ্যক্ষের জন্য গ্রেড-৩-এ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল বেতনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের প্রস্তাবিত ১০ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ হারে দেওয়া, উৎসব ভাতা ও বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের সমপরিমাণ করা এবং অবসর ফান্ডের টাকা অবসরের ৬ মাসের মধ্যে পরিশোধ করা। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নতুন পে স্কেলেও বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হবেন বলে আশঙ্কা আছে। সরকারি কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা নতুন পে স্কেলে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যেখানে এমপিও শিক্ষকরা এখনো মাত্র ৫০০ টাকা পাচ্ছেন। পে কমিশনের গেজেট প্রকাশের পরই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বলে জানা গেছে। শিক্ষকরা অপেক্ষায় আছেন, এবার অন্তত একটা সম্মানজনক বেতন কাঠামো মিলবে কিনা।
By using this site, you agree to our Cookie Policy .