ইনজেকশন নিলে কি রোজা ভাঙে?

ডিপি প্রতিবেদন
ডিপি প্রতিবেদন
২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | সকাল ১১:১১
ছবিঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ ইন্টারনেট

রোজা অবস্থায় ইনজেকশন নেওয়া যাবে কিনা, এই প্রশ্নটা প্রতি রমজানেই লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে ঘোরে। বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো রোগে ইনসুলিন বা নিয়মিত ওষুধ নেন, তাদের জন্য এই প্রশ্নটা শুধু ধর্মীয় নয়, স্বাস্থ্যগতভাবেও জরুরি।

রমজান মাস এলে অনেক রোগী বিপদে পড়ে যান। ডাক্তার বলছেন ইনজেকশন নিতে হবে, কিন্তু মনে সংশয়, রোজা ভাঙবে কিনা। অনেকে ভয়ে ইনজেকশন বন্ধ করে দেন, শরীরের ক্ষতি করেন। অথচ ইসলামি শরিয়তে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আছে, শুধু সেটা অনেকে জানেন না।

রোজা ভাঙার মূলনীতি কী?

আগে বুঝতে হবে রোজা কোন কারণে ভাঙে। ইসলামি ফিকাহ শাস্ত্র অনুযায়ী রোজা ভাঙার জন্য তিনটি শর্ত একসাথে পূরণ হতে হবে। প্রথমত, কাজটি ইচ্ছাকৃত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, পেট বা মস্তিষ্ক পর্যন্ত কিছু পৌঁছাতে হবে। তৃতীয়ত, সেটা স্বাভাবিক পথে অর্থাৎ মুখ, নাক বা এ জাতীয় খোলা পথ দিয়ে প্রবেশ করতে হবে।

এই তিনটি শর্তের আলোকেই ইনজেকশনের বিষয়টা বিচার করতে হবে।

ইনজেকশন নিলে কি রোজা ভাঙে?

অধিকাংশ আধুনিক ইসলামি স্কলার এবং ফিকাহ একাডেমির সিদ্ধান্ত হলো, সাধারণ ইনজেকশনে রোজা ভাঙে না। কারণ ইনজেকশন মুখ বা পাকস্থলীর স্বাভাবিক পথে প্রবেশ করে না, সরাসরি শিরা বা মাংসপেশিতে দেওয়া হয়। এটা খাওয়া বা পান করার সমতুল্য নয়।

রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামির ফিকাহ কাউন্সিল এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকাহ একাডেমি উভয়ই এই মতামত দিয়েছে যে ইনজেকশন রোজা ভাঙে না, যদি সেটা পুষ্টির উদ্দেশ্যে না হয়।

হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ

সরাসরি ইনজেকশনের কথা হাদিসে নেই, কারণ সেই যুগে ইনজেকশন ছিল না। কিন্তু রোজা ভাঙার কারণ সম্পর্কিত হাদিসগুলো থেকে আলেমরা ইনজেকশনের বিধান বের করেছেন।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "রোজা ভাঙে শুধু সেই কারণে যা পেটে প্রবেশ করে।" এই হাদিসটি ইমাম বায়হাকি তাঁর সুনানে বর্ণনা করেছেন। এই হাদিসের ভিত্তিতেই আলেমরা বলেন, যেহেতু ইনজেকশন পেটে প্রবেশ করে না বরং শিরায় বা মাংসে যায়, তাই রোজা ভাঙার প্রশ্ন আসে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আছে, যেখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ভুলে গিয়ে খেয়ে বা পান করে ফেলে, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে। কারণ আল্লাহ তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।" এই হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম উভয়তেই বর্ণিত আছে। এটি থেকে বোঝা যায়, ইসলামে নিয়ত এবং স্বাভাবিক পথকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়ায় বলেছেন, রোজা ভাঙার কারণ হলো মুখ দিয়ে কিছু খাওয়া বা পান করা। যা এই পথে আসে না, তা রোজা ভাঙার কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে না।

কোন ইনজেকশনে রোজা ভাঙে না

সাধারণ ওষুধের ইনজেকশন যেমন অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক, ডায়াবেটিসের ইনসুলিন, রক্তচাপের ওষুধ, ভ্যাকসিন বা টিকা এবং ডায়ালাইসিস রোগীদের রক্ত পরিষ্কারের ইনজেকশনে রোজা ভাঙে না। এগুলো সরাসরি শিরা বা মাংসে যায়, পেটে নয়।

কোন ইনজেকশনে রোজা ভেঙে যাবে

গ্লুকোজ স্যালাইন বা পুষ্টিকর তরল যদি শিরার মাধ্যমে দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে অধিকাংশ আলেমের মতে রোজা ভেঙে যাবে। কারণ এটা খাবারের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে এবং শরীরে পুষ্টি সরবরাহ করছে। এক কথায়, উদ্দেশ্য যদি পুষ্টি গ্রহণ হয়, তাহলে রোজা ভাঙবে।

রক্ত পরীক্ষার জন্য সুই ফোটানো

শুধু রক্ত পরীক্ষার জন্য সুই দিয়ে রক্ত নিলে রোজা ভাঙবে না। কারণ এখানে শরীরে কিছু প্রবেশ করানো হচ্ছে না, বরং বের করা হচ্ছে। ইসলামিক স্কলাররা এই বিষয়ে একমত।

একটা জরুরি কথা মনে রাখতে হবে। ইনজেকশন নিলে রোজা না ভাঙলেও, যদি কেউ এতটাই অসুস্থ থাকেন যে রোজা রাখলে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে ইসলামে তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, যে অসুস্থ বা সফরে থাকে, সে অন্য দিনে এই সংখ্যা পূরণ করবে। এই আয়াত সূরা আল-বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত থেকে নেওয়া।

সুতরাং ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত যারা নিয়মিত ইনজেকশন নেন, তারা নিশ্চিন্তে রোজা রাখতে পারবেন। তবে শরীরের অবস্থা বিবেচনা করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াটা জরুরি, কারণ ধর্ম কখনো স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে রোজা রাখার নির্দেশ দেয় না।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

ধর্ম থেকে আরো

আরো দেখুন
গ্রাফিকঃ দিগন্ত পোস্ট
হজের খরচ কমানো নিয়ে সুখবর দিলেন ধর্মমন্ত্রী!

হজযাত্রীদের জন্য সুখবর এলো ধর্মমন্ত্রীর কাছ থেকে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে হজের খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান প্রশ্ন রেখে জানতে চেয়েছিলেন, বর্তমান সরকার হজ পালনে খরচ কমানোর লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা। এর উত্তরে ধর্মমন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৬ সালের হজ প্যাকেজ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং সৌদি আরব ও বাংলাদেশ পর্বের বিভিন্ন খরচ পরিশোধও সম্পন্ন হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ভিসাসহ সব কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হবে। তবে আশার কথা হলো, মন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ প্রণয়ন ও ঘোষণার সময় হজযাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা এবং চাহিদার ভিত্তিতে সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে হজ প্যাকেজের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে হজযাত্রীদের খরচের চাপ কমতে পারে বলে আশা করা যাচ্ছে।

ডিপি প্রতিবেদন ৭ এপ্রিল, ২০২৬ 0
ছবিঃ ইন্টারনেট

কবে থেকে শুরু হচ্ছে এবারের হজ ফ্লাইট? যা জানালেন ধর্মমন্ত্রী

ছবিঃ পিক্সাবেই

রোজা রেখে রক্ত দেওয়া যাবে কি?

ছবিঃ ইন্টারনেট

ইনজেকশন নিলে কি রোজা ভাঙে?

ছবিঃ পিক্সাবেই
রোজা অবস্থায় বীর্যপাত হলে কি রোজা ভেঙে যাবে?

রোজা অবস্থায় বীর্যপাত হলে রোজা ভাঙবে কিনা, এই প্রশ্নটা অনেকের মনে থাকলেও লজ্জায় কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় না। অথচ ইসলামিক শরিয়তে এই বিষয়ে একদম স্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে। রমজান মাস এলে অনেক প্রশ্নই মাথায় ঘোরে। কোনটায় রোজা ভাঙে, কোনটায় ভাঙে না। কিছু প্রশ্ন সহজে করা যায়, কিছু প্রশ্ন গলায় আটকে থাকে। বীর্যপাতে রোজা ভাঙার বিষয়টা ঠিক এই দ্বিতীয় ধরনের একটা প্রশ্ন। কিন্তু ইসলামি ফিকাহ শাস্ত্রে এই প্রশ্নের উত্তর লুকানো নেই, বরং সরাসরি আলোচনা করা হয়েছে। মূল বিষয় হলো, সব ধরনের বীর্যপাত এক রকম নয়। কীভাবে বীর্যপাত হলো, সেটার উপর নির্ভর করে রোজা ভাঙবে কিনা। স্বামী-স্ত্রীর সহবাসে রোজা ভাঙে এটা সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয়। রোজা অবস্থায় দিনের বেলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহবাস হলে রোজা ভেঙে যাবে, এই ব্যাপারে সব মাজহাবের আলেমরা একমত। শুধু রোজা ভাঙাই না, এক্ষেত্রে কাফফারাও দিতে হবে। কাফফারা মানে একটানা ৬০টি রোজা রাখা, অথবা ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো। হস্তমৈথুনে রোজা ভাঙে ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে যাবে। হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি এবং হাম্বলি সব মাজহাবেই এই মতামত প্রায় একই। তবে এক্ষেত্রে কাফফারা দিতে হবে না, শুধু ওই রোজাটির কাজা অর্থাৎ পরবর্তীতে একটি রোজা রেখে দিতে হবে। স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভাঙে না ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভাঙবে না। এটা ইচ্ছাকৃত কোনো কাজ নয়, তাই শরিয়তে এর জন্য কোনো দায় নেই। তবে গোসল ফরজ হয়ে যাবে। যত দ্রুত সম্ভব ফরজ গোসল করে নামাজ আদায় করতে হবে। গোসল না করলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু নামাজ পড়া যাবে না। মনে মনে চিন্তা করলে বা দেখলে কী হয়? শুধু মনে মনে যৌন চিন্তা করলে বা কিছু দেখে উত্তেজিত হলে রোজা ভাঙে না, যদি বীর্যপাত না হয়। তবে রোজার পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এ ধরনের চিন্তা ও পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকা উচিত। তরল বের হলে কী হয়? মযি হলো উত্তেজনার সময় বের হওয়া পাতলা তরল, যেটা বীর্য নয়। অধিকাংশ আলেমের মতে শুধু মযি বের হলে রোজা ভাঙে না। তবে ওজু ভেঙে যাবে, তাই নামাজের আগে ওজু করতে হবে।  একটা সহজ নিয়ম মনে রাখুন ইসলামি ফিকাহের মূলনীতি অনুযায়ী রোজা ভাঙার ক্ষেত্রে দুটো শর্ত থাকতে হবে। প্রথমত, কাজটি ইচ্ছাকৃত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, শরীরের ভেতরে কিছু প্রবেশ করানো বা শরীর থেকে এমন কিছু বের করা যা নিষিদ্ধ। স্বপ্নদোষ ইচ্ছাকৃত নয় বলেই রোজা ভাঙে না। হস্তমৈথুন ইচ্ছাকৃত বলেই রোজা ভেঙে যায়। যেকোনো সন্দেহ থাকলে স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির কাছ থেকে সরাসরি মাসআলা জেনে নেওয়াটাই সবচেয়ে নিরাপদ। ধর্মীয় বিষয়ে লজ্জা না পেয়ে জেনে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ডিপি প্রতিবেদন ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ 0