সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব যেন থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এদের মধ্যে একজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে, আর বাকি দুজন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার থেকে এই উদ্বেগজনক খবর জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হিসেব করলে দেখা যায়, নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি প্রায় ১৬৬ জন। কেবল মৃত্যুই নয়, প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ছুঁইছুঁই, আর সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১৯ হাজার।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, রাজধানী ঢাকা এখন হামের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু ঢাকাতেই ৫০৫ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং এর মধ্যে ৬১ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের জীবাণু পাওয়া গেছে। একদিনে যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে দুজনই ঢাকার। ঢাকার বাইরে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগেও সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তবে রাজধানীর তুলনায় সেখানে আক্রান্তের হার কিছুটা কম।
হামের প্রকোপ বাড়ায় দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চাপ বাড়ছে। এখন পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনো অনেকেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম থেকে বাঁচতে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। বিশেষ করে বর্তমানে ঢাকার যে পরিস্থিতি, তাতে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সামান্য জ্বর বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
গরমের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে, কখনো হঠাৎ বৃষ্টি আবার কখনো তীব্র রোদ। আর রোদে বাইরে বের হলেই শরীর ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা এখন অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি অনেক সময় হিট স্ট্রোকের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে, যা সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে জীবনঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি করতে পারে। হিট স্ট্রোক হলো এমন একটি অবস্থা যখন শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সাধারণত দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করা, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া এবং শরীর অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়ার পর এটি ঘটে। হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে যা করবেন গরমে শরীরকে ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু সহজ অভ্যাস মানলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। প্রথমত, রোদে বের হওয়ার আগে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে। দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা উচিত। এই সময় সূর্যের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। তৃতীয়ত, বাইরে গেলে হালকা, ঢিলেঢালা ও সুতির কাপড় পরা ভালো। এতে শরীর সহজে বাতাস পায় এবং ঘাম শুকাতে সাহায্য করে। চতুর্থত, মাথায় টুপি, ছাতা বা ভেজা কাপড় ব্যবহার করলে সরাসরি রোদের তাপ কম লাগে। পঞ্চমত, দীর্ঘ সময় কাজ করলে মাঝেমধ্যে ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। ষষ্ঠত, শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হলে বা মাথা ঘুরলে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা জায়গায় চলে যাওয়া উচিত। সপ্তমত, সম্ভব হলে লবণ ও পানি মিশ্রিত পানীয় বা ওআরএস খাওয়া শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে। হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তারা হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বল লাগা, ত্বক শুকিয়ে যাওয়া, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব এবং দ্রুত হৃদস্পন্দন। চিকিৎসকদের মতে, এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত শীতল স্থানে যেতে হবে এবং শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন হিট স্ট্রোক বাড়ছে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গরমের তীব্রতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শহরে কংক্রিটের ঘনত্ব, গাছপালা কমে যাওয়া এবং যানবাহনের চাপও তাপমাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। গ্রাম ও শহর উভয় জায়গাতেই শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ তারা দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করেন। হিট স্ট্রোক কোনো সাধারণ ক্লান্তি নয়, এটি একটি জরুরি স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই গরমে শরীরকে অবহেলা করা ঠিক নয়। পানি পান, বিশ্রাম এবং রোদের সময় সচেতনতা এই তিনটি অভ্যাসই পারে আপনাকে বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে। গরম যতই বাড়ুক, একটু সচেতন থাকলেই হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, "দিনে অন্তত ৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত।" কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, এই ধারণাটি সবার জন্য সঠিক নয়। আর এই তীব্র গরমে আমাদের মনে হতে পারে অতিরিক্ত পানি খেলে হয়তো শরীরে পানি শূন্যতা পূরণ হবে এমনকি বারবার পিপাসা পেলে আমরা অধিক পরিমাণ পানি খাই। কিন্তু অতিরিক্ত পানি পান আপনার শরীরের জন্য উল্টো বিপদের কারণ হতে পারে। আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানবো, আপনার শরীরের ওজন এবং কাজের ধরন অনুযায়ী ঠিক কতটুকু পানি আপনার জন্য প্রয়োজন। ৮ গ্লাস পানির ধারণা কি ভুল? ১৯৪৫ সালে প্রথম '৮ গ্লাস পানি'র একটি গাইডলাইন সামনে আসে। কিন্তু মানুষ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলে যায়—আমরা প্রতিদিন যে খাবার (ফলমূল, সবজি, ডাল) খাই, তার থেকেও প্রচুর পানি শরীরে প্রবেশ করে। তাই ঢকঢক করে আলাদাভাবে ৮ গ্লাস পানি সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। দিনে কতটুকু পানি পান করা উচিত? পুষ্টিবিদদের মতে, পানির চাহিদা নির্ভর করে আপনার ওজনের ওপর। একটি সহজ হিসাব মনে রাখতে পারেন: আপনার শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৩৫ মিলি পানি প্রয়োজন। হিসাবটি এমন: যদি আপনার ওজন ৬০ কেজি হয়, তবে ৬০ × ৩৫ = ২১০০ মিলি (অর্থাৎ ২.১ লিটার)। যদি আপনার ওজন ৮০ কেজি হয়, তবে ৮০ × ৩৫ = ২৮০০ মিলি (অর্থাৎ ২.৮ লিটার)। পিপাসা লাগলেই কি পানি খাবেন? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শরীর যখন পানির অভাব বোধ করে, তখন সে 'পিপাসা'র মাধ্যমে সংকেত দেয়। তাই জোর করে পানি পান করার চেয়ে পিপাসা মেটানোই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে বয়স্ক এবং শিশুদের ক্ষেত্রে পিপাসার সংকেত অনেক সময় কাজ করে না, তাদের নিয়মিত বিরতিতে পানি পান করানো উচিত। কীভাবে বুঝবেন আপনি কম পানি খাচ্ছেন? আপনার শরীর নিজেই জানান দেবে যে সে তৃষ্ণার্ত। যদি প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হয়, বুঝবেন আপনি ডিহাইড্রেটেড। আদর্শ রং হবে একদম হালকা হলুদ বা পানির মতো হয়। যদি বারবার ঠোঁট বা মুখ শুকিয়ে আসে। তারপরে পর্যাপ্ত পানির অভাবে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হতে পারে, যা মাথাব্যথার কারণ।এবং সবশেষে কোনো কারণ ছাড়াই দুর্বল লাগা। এই লক্ষণ গুলো দেখলেই বুঝবেন আপনার পানি খাওয়া কম হচ্ছে তাই নির্ধারিত পরিমাণ পানি অবশ্যই খাবেন অতিরিক্ত পানি পানে যে সমস্যা হতে পারে বেশি পানি পান করলে রক্তের সোডিয়ামের মাত্রা অতিরিক্ত কমে যেতে পারে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় 'হাইপোনাট্রেমিয়া' বলে। এর ফলে মস্তিষ্ক ফুলে যাওয়া বা কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই 'বেশি ভালো' মনে করে লিটার লিটার পানি পান করা বন্ধ করুন। কখন পানি পান করা জরুরি? ১. ঘুম থেকে উঠে: শরীরকে সচল করতে এক গ্লাস পানি চমৎকার কাজ করে। ২. ব্যায়ামের আগে ও পরে: ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যে পানি বেরিয়ে যায়, তা পূরণ করতে। ৩. তীব্র গরমে: আমাদের দেশের মতো আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘাম বেশি হয়, তাই পানির পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো উচিত।
দেশে হামের পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায়ই প্রাণ হারিয়েছেন আরও তিনজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে সারাদেশে ৫ হাজার ৭৯২ জন শিশুকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ৭৭১ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায়ই নতুন করে ৯৪৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বিভাগওয়ারি চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকা বিভাগ। এখানে এক দিনেই ৩১৫ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং নতুন শনাক্তের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ জনই ঢাকার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। খুলনা ও সিলেটে ৫ জন করে, চট্টগ্রামে ৪ জন এবং বরিশাল ও রংপুরে ১ জন করে নতুন আক্রান্ত পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহ বিভাগে এই ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে রংপুরের হাসপাতালগুলোতে সবচেয়ে কম ৪২ জন ভর্তি রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোববার থেকে শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
By using this site, you agree to our Cookie Policy .