দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্প খাত ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং শিল্প খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী গণশুনানির প্রথম দিনে এসব মন্তব্য উঠে আসে। শুনানিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার খুচরা পর্যায়ের বিদ্যুতের মূল্যহার নিয়ে দ্বিতীয় দিনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। গণশুনানিতে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে বিইআরসি জনগণের কাছে ‘গণশত্রুতে’ পরিণত হবে। তাঁর ভাষায়, সরকার যে ভর্তুকি দেয়, সেটাও তো জনগণের টাকায়। কিন্তু মানুষের কষ্টের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, দেশে নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও বিইআরসিতে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করেও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্প খাত আরও প্রতিযোগিতা হারাবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে শিল্প-কারখানায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেছে বিপিডিবি। সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, গত দুই বছরে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। বাকি বিদ্যুৎ দেশেই উৎপাদিত হলেও সেই উৎপাদনেও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ খাতে পড়ছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। বিইআরসির হিসাবে এই ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো ঘাটতি পূরণ নয়, বরং ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের নীতিমালায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে এবং সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত এগোতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে এবং জনগণের ওপর চাপও কমবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শুধু বাসাবাড়ির বিলই বাড়বে না, এর প্রভাব পড়বে বাজারের প্রায় সব পণ্যের দামে। কারণ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প খাত সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ একটি বড় ব্যয়। ফলে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকাসহ দেশের ১১টি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু তাপপ্রবাহ, যার কারণে ভ্যাপসা গরমে সাধারণ মানুষের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে । আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে দেওয়া আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাসে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। পূর্বভাসে জানানো হয়েছে, ঢাকা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, চাঁদপুর এবং লক্ষ্মীপুর জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে । গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রামগতিতে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস । সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত গত কয়েকদিনের আবহাওয়ার খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির কারণে বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। আর এই কারণেই থার্মোমিটারের তাপমাত্রার চেয়েও মানুষের শরীরে অনেক বেশি ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। মে মাসের এই ভ্যাপসা গরম আর প্রখর রোদ সাধারণ খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ নামিয়ে এনেছে। বিশেষ করে যারা রাস্তায় কাজ করেন, তীব্র তাপদাহে তাদের জন্য দিন পার করাটা বেশ কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে অনেকেই ক্লান্তি ও পানিশূন্যতায় ভুগছেন। তবে সাধারণ মানুষের এই কষ্টের মাঝেই কিছুটা স্বস্তির খবরও আছে। পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় আজ অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি হতে পারে । এমনকি এসব এলাকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণেরও শঙ্কা রয়েছে । গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সৈয়দপুরে, ৮১ মিলিমিটার । বৃষ্টির কারণে সারা দেশে আজ দিনের ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে, যা জনজীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে । এছাড়া আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস ।
দেশের পানিসংকট মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারেজের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারেজ নিয়েও কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে এবং এখনই বিকল্প ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। বুধবার টঙ্গীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, গত দুই দশকে ভূগর্ভ থেকে যে পরিমাণ পানি তোলা হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার সুযোগ নেই। খাল ও নদী খনন করে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ছড়িয়ে দিলেও আগামী ২০ বছরে সেই ঘাটতি পূরণ হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, “কোনোভাবেই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা যাবে না। এটা এখন আমাদের জন্য বিপদজনক হয়ে যাচ্ছে। সবার জন্য পানি নিশ্চিত করতে পদ্মা ব্যারেজের পাশাপাশি বিএনপি তিস্তা ব্যারেজ নিয়েও কাজ করবে।” খাল ও নদী খননের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলার সঙ্গেও খাল ও নদীর সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষায়, “খাল ও নদী খননের মাধ্যমে ভূমিকম্প মোকাবিলা করতে হবে। তাই আমাদের আরও বেশি খাল খনন করতে হবে।” দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে হলে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন, মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। অনুষ্ঠানে নতুন গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচনের পাশাপাশি পুকুরে মাছ অবমুক্ত ও বৃক্ষরোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে পানিব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে তিস্তা অববাহিকায় দীর্ঘদিন ধরেই পানির সংকট নিয়ে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে তিস্তা ব্যারেজ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই দেখছেন অনেকে
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার থাকছে না কোনো দলীয় প্রতীক। দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও, তৃণমূলের এই ভোটে সংঘাত ও রক্তপাত এড়াতে নির্বাচন কমিশন এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। আজ সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে তিনি এই তথ্য জানান। ‘রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি)’-এর নতুন কমিটির দায়িত্বগ্রহণ ও বিদায়ী কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, এবার দলীয় প্রতীক ব্যবহার না হলেও রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করেছে। আর এই বিষয়টিই মাঠপর্যায়ে নির্বাচনকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হতে পারে। কারণ, বিগত কয়েক বছরে গ্রামে-গঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মার্কার কারণে একই এলাকার মানুষ, এমনকি আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেও তীব্র বিভেদ ও হানাহানি দেখা গেছে। মার্কা তুলে দেওয়ার ফলে প্রার্থীরা এখন দলের চেয়ে নিজেদের যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ভোট চাইবেন, যা তৃণমূলের রাজনীতিতে সুস্থ প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে। এতে সাধারণ ভোটাররাও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে সিইসি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি রক্তপাতহীন নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশে একটি ভালো ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করা দরকার। শুধু সামনের একটি নির্বাচন নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতিটি নির্বাচন যেন সত্যিকার অর্থে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়, সেটাই বর্তমান কমিশনের মূল লক্ষ্য। তবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শুধু নির্বাচন কমিশনের একার চেষ্টাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সিইসি নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক এবং সাধারণ ভোটারসহ সবার আন্তরিক সহযোগিতা পেলেই কেবল একটি সফল নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব। এই লক্ষ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এবার দেশজুড়ে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
By using this site, you agree to our Cookie Policy .