দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে দেশের সব মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনে কেবল 'বাংলা কিউআর' ব্যবহার করতে হবে, অন্য কোনো কিউআর কোড দিয়ে লেনদেন করা যাবে না। এই নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেশের সব ব্যাংক, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান এবং লেনদেন অপারেটরকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজস্ব কিউআর কোড বাদ দিয়ে বাংলা কিউআরে পুরোপুরি রূপান্তরিত হতে হবে। পাশাপাশি কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনে প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেনের সুবিধা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যে প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের কিউআর কোড বাতিল করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এর আগে জানিয়েছিলেন, নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো এবং পুরো পেমেন্ট ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ১০ লাখেরও বেশি মার্চেন্ট পয়েন্টে নিজস্ব আলাদা কিউআর কোড ব্যবহার করছে। এই বিশাল সংখ্যক পয়েন্টকে বাংলা কিউআরে রূপান্তর করার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ এবং বেশ ব্যয়বহুলও বটে। খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলা কিউআর পুরোপুরি চালু হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনের অংশ ভাগ করে নিতে হবে, ফলে আলাদা প্ল্যাটফর্মে যে একচেটিয়া সুবিধা পাওয়া যেত তা আর থাকবে না। এই কারণেই কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি আগ্রহী নয়।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি উপযুক্ত আর্থিক প্রণোদনা দেয়, তাহলে এই বাধা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তারা মনে করছেন। এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ১ হাজার ২০০ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বাংলা কিউআরের আওতায় এনেছিল।
সেই চেষ্টা প্রত্যাশামতো ফল না দেওয়ায় এবার সরাসরি বাধ্যতামূলক করার পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবার কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা আগের চেয়ে অনেক বেশি।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও খেজুরসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের ওপর নতুন করে কোনো কর বাড়ানো হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক দীর্ঘ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সিদ্ধান্তের অনুমোদন দিয়েছেন। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলা ওই বৈঠকে এনবিআরের প্রস্তাবিত খসড়া পর্যালোচনা করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে এসব পণ্যের ওপর থাকা উৎসে কর আগের মতোই দশমিক ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন বাজেটে ডাল বা চিনির মতো নিত্যপণ্যের দাম করের কারণে বাড়ার কোনো আশঙ্কা থাকছে না। বৈঠকে আরও জানানো হয়, সাধারণ মানুষের ব্যাংক জমার ওপরও থাকছে বিশেষ সুবিধা। ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক জমার ক্ষেত্রে কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না গ্রাহকদের। তবে মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিলেও বিলাসবহুল জীবনযাপনে কড়াকড়ি আরোপ করছে সরকার। ৩ হাজার ৫০০ সিসির বেশি ব্যক্তিগত গাড়ির অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া অনলাইন গেমিং থেকে আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ কর বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন বাজেটে করের জাল বাড়াতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তবে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে ভ্যাট কর্মকর্তার কোনো অনুমোদন ছাড়াই অনলাইনে তাৎক্ষণিক এই নম্বর পাওয়া যাবে। এনবিআর জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৬ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে। চাল, ডাল ও চিনির মতো পণ্যে কর না বাড়ানোর ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের যে কৃত্রিম উল্লম্ফন দেখা দেয়, তা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন মূল্যস্ফীতি বড় চ্যালেঞ্জ, তখন এই সিদ্ধান্তকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য ‘অক্সিজেন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিত্যপণ্যে কর না বাড়ালেও মোটরবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা যাতায়াত খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, ৩ হাজার ৫০০ সিসির গাড়িতে কর ৫ গুণ বাড়ানো হয়েছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে—সরকার রাজস্ব আদায়ের মূল চাপটি সাধারণ মানুষের বদলে উচ্চবিত্তদের ওপরই রাখতে চাইছে।
টানা বৃষ্টি আর ডিজেল সংকটের প্রভাবে দেশের ডিমের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে এখন প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খামারের লাল ডিম প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১২ টাকায়। সাদা ডিমের দাম প্রতি ডজন ১৪০ টাকা। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও লাল ডিম বিক্রি হয়েছিল ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা এবং সাদা ডিম ১২০ থেকে ১২৫ টাকার মধ্যে। মঙ্গলবার তেজগাঁও ডিমের পাইকারি বাজারে লাল ডিম প্রতি পিস বিক্রি হয়েছে ১০ টাকা ৮০ পয়সা এবং সাদা ডিম ১০ টাকায়। খামার পর্যায়ে লাল ডিমের দাম ছিল প্রতি পিস ১০ টাকা ৪০ পয়সা। শাহজাদপুরের ডিম বিক্রেতা আল আমিন বলেন, পাইকারি পর্যায়েই দাম বেড়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। খামারিদের অভিযোগ, টানা ভারী বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়ার কারণে ডিম উৎপাদন কমে গেছে। তারা বলছেন, গত ৮ থেকে ১০ দিনের বৃষ্টির কারণে খামারে পর্যাপ্ত আলো পাওয়া যাচ্ছে না, যা ডিম উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি ডিজেল সংকটের কারণে অনেক খামারেই জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব এবং ইউনাইটেড অ্যাগ্রো কমপ্লেক্সের মালিক খন্দকার মোহাম্মদ মহসিন বলেন, তার খামারের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ২০ হাজার লেয়ার মুরগির হলেও বর্তমানে তিনটি খামারে রয়েছে মাত্র ১৫ থেকে ১৭ হাজার মুরগি। তিনি বলেন, “ডিজেল সংকটের কারণে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। তিন দিনের জন্য মাত্র ১০ লিটার ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।” তিনি আরও জানান, গত ৭ থেকে ৮ মাস ধরে খামারিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করেছেন। যেখানে উৎপাদন খরচ প্রতি ডিমে ১০ থেকে ১০ টাকা ৫০ পয়সা, সেখানে দীর্ঘ সময় পাইকারিতে ডিম বিক্রি হয়েছে ৭ থেকে ৮ টাকায়। এতে লোকসানে পড়ে অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিয়েছেন বা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। মহসিন বলেন, “মেঘলা আবহাওয়া ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ডিম উৎপাদন ১২ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। পর্যাপ্ত আলো না থাকলে মুরগির উৎপাদন কমে যায়।” বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে বলেন, লেয়ার মুরগির জন্য প্রতিদিন অন্তত ১৬ ঘণ্টা আলো প্রয়োজন। দিনের আলোর পাশাপাশি অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোরও দরকার হয়। কিন্তু টানা মেঘলা আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত আলো না পাওয়ায় মুরগির হরমোনে প্রভাব পড়ে এবং ডিম উৎপাদন কমে যায়। তিনি আরও বলেন, এ বছর স্বাভাবিক সময়ের আগেই ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অনেক খামারি প্রস্তুত না থাকায় সমস্যায় পড়েছেন। ডিমের হঠাৎ দাম বৃদ্ধিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। গুলশানের একটি বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহিদুল ইসলাম বলেন, “চাল, তেল, চিনি, মাছ-মাংস সবকিছুর দামই বেশি। ডিমটাই কিছুটা নাগালের মধ্যে ছিল, এখন সেটার দামও ডজনপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে গেছে।” বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘদিনের লোকসানের কারণে খামার কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে সামনে ডিমের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। বিশ্ববাজার ও স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ স্বর্ণের দাম কমায় প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা হ্রাস করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন দর আজ সোমবার ২৭ এপ্রিলও অপরিবর্তিত রয়েছে। আজকের স্বর্ণের দাম (প্রতি ভরি) ২২ ক্যারেট — ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকা ২১ ক্যারেট — ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা ১৮ ক্যারেট — ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা সনাতন — ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকা আজকের রুপার দাম (প্রতি ভরি) ২২ ক্যারেট — ৫ হাজার ৭১৫ টাকা ২১ ক্যারেট — ৫ হাজার ৪২৪ টাকা ১৮ ক্যারেট — ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা সনাতন — ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা বাজুস জানিয়েছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৫৬ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ বার বেড়েছে এবং ২৪ বার কমেছে। একই সময়ে রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছে ৩৫ বার। গত ১৫ এপ্রিল দাম বাড়ানোর পর আবার কমায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
By using this site, you agree to our Cookie Policy .