বিশ্বের বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ। একদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সংকট, অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর উত্থান। এই দ্বিমুখী চাপে এখন দিশেহারা দেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা।
মার্কিন শুল্ক বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ১৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৮.৫ শতাংশ কম। উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে চীন ও ভারতের রপ্তানি কমলেও ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে বাজার হারাচ্ছে, তা দখল করে নিচ্ছে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো।
কেন কমছে রপ্তানি?
দেশীয় উদ্যোক্তাদের মতে, মার্কিন বাজারে রপ্তানি কমার পেছনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের চেয়ে অভ্যন্তরীণ জটিলতাই বেশি দায়ী। নেক্সাস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. রশিদ আহমেদ হোসাইনী বলেন, "প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন আনলেও আমাদের দেশে সেই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে অনুকরণনির্ভর রয়ে গেছি।"
এছাড়া গত কয়েক মাসে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো রপ্তানিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে:
বিকল্প পথ খুঁজছে বিজিএমইএ
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সোর্সিংয়ে বৈচিত্র্য আনার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, "সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অনিশ্চয়তা। আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সোলার এনার্জিতে গুরুত্ব দিতে হবে যাতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।"
বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, "রপ্তানিকারকদের টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্যাকেজ প্রয়োজন। স্বল্প সুদে ঋণ এবং প্রয়োজনে ঋণের কিস্তি পুনর্নির্ধারণ (রিশিডিউলিং) সুবিধা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।"
উল্লেখ্য, বছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানিও প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ কমেছে। বাজার যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন নিজের হিস্যা ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে না পারা গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ০ দশমিক ৫ শতাংশ হারে দণ্ড সুদ নিতে পারবে। আগে এই হার ছিল সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ। বুধবার (১৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে। পরে সেটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি আংশিক বা পুরোপুরি বকেয়া হয়ে গেলে ওই সময়ের জন্য দণ্ড সুদ আরোপ করা যাবে। চলমান ঋণ ও তলবি ঋণের ক্ষেত্রে পুরো ঋণস্থিতির ওপর এবং মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে বকেয়া কিস্তির ওপর এই সুদ হিসাব করা হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা ০ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এর আগে একই ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত দণ্ড সুদ নিতে পারত। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে গ্রাহকদের অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৮ মে জারি করা আগের সার্কুলারের কিছু অংশ সংশোধন করে এই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আগের বাকি নির্দেশনাগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে উচ্চ সুদের চাপের কারণে অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ ঋণগ্রহীতা সাম্প্রতিক সময়ে কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছিলেন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত দণ্ড সুদ অনেক সময় বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দণ্ড সুদ কমানো হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ অতিরিক্ত জরিমানার ভয় কমলে অনেক গ্রাহক পুনরায় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে আগ্রহী হতে পারেন। তবে ব্যাংক খাতের কেউ কেউ বলছেন, শুধু দণ্ড সুদ কমালেই হবে না, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সঠিক তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা। আজ শনিবার (৯ মে) থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর গোল্ডের দাম বাড়ায় স্বর্ণের নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। নতুন দামে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হবে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকায়। ১৮ ক্যারেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২০৩ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম রাখা হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকা। এর আগে গত ৬ মে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন ২২ ক্যারেটের ভরিপ্রতি দাম ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকা। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়ায় স্বর্ণের বাজারে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৬৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ বার দাম বেড়েছে, আর কমেছে ২৮ বার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামা এবং স্থানীয় বাজারে কাঁচা সোনার মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেই দেশের বাজারে বারবার দাম পরিবর্তন হচ্ছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা ‘ফুয়েল সারচার্জ’ নামে নতুন মাশুল বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কারণ দেখিয়ে সাড়ে ৮ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হয়েছে। গত সোমবার স্টেকহোল্ডারদের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে জানানো হয়, রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে নতুন এই চার্জ কার্যকর হবে। বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সহায়ক অংশ হিসেবে ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বা অফডক কাজ করছে। দেশের শতভাগ রপ্তানি পণ্য এবং ৬৪ ধরনের আমদানি পণ্যের হ্যান্ডলিং হয় এসব ডিপোতে। বছরে গড়ে ৩ লাখ আমদানি ও সাড়ে ৭ লাখ রপ্তানি কনটেইনার পরিচালনা করা হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় গঠিত ট্যারিফ কমিটির অনুমোদন ছাড়া কোনো মাশুল বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। কিন্তু বিকডা কোনো কমিটি বা ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা না করেই একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ঘটনায় তৈরি পোশাক খাতসহ আমদানি-রপ্তানিনির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিজিএমইএর পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, বিকডা আলাদা কোনো সত্তা নয়, এটি বন্দরের অংশ। বন্দর, মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। এতে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা উদ্বিগ্ন। বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, বিশ্ববাজারে আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও দেশের অন্য কোনো খাত এত দ্রুত বাড়তি চার্জ নেয়নি। অফডক কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মাশুল বাড়ানোর চিঠি দিয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে বিকডার দাবি, এটি মাশুল বৃদ্ধি নয়, বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে ফুয়েল সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। বিকডার সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার বলেন, অফডকের যন্ত্রপাতি, লরি ও কনটেইনার পরিবহন সবই ডিজেলনির্ভর। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ হিসাব করে সাড়ে ৮ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ট্যারিফ কমিটি থাকলেও তা দীর্ঘদিন কার্যকর হয়নি। হঠাৎ তেলের দাম বাড়ায় কার্যক্রম সচল রাখতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
By using this site, you agree to our Cookie Policy .